খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৪:১৮ পিএম
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের অন্যতম নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো তাদের মাটিতে টেস্ট জয়ের কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ। আর সেই জয়ের শেষ ধাপ তৈরি করে দিয়েছে মিরাজের দুর্দান্ত বোলিং।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ ৫ উইকেট নিয়ে ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধস নামান। তার নিয়ন্ত্রিত অফস্পিনের সামনে একের পর এক উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেমে যায় ২৮৪ রানে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। সেই রান ৯ উইকেট হাতে রেখেই তুলে নেয় সফরকারীরা।
এই জয় শুধু বাংলাদেশের প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরের টেস্ট সাফল্য নয়, দেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেও একটি বড় মাইলফলক। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ টেস্ট জিতেছিল কেবল একবার—২০১৭ সালে ঢাকার মিরপুরে। এবার প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারিয়ে সেই অপেক্ষারও অবসান হলো।
মিরাজের পাঁচ উইকেটের কীর্তিটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে কোনো সফরকারী স্পিনারের পাঁচ উইকেট নেওয়ার বিরল তালিকায় তিনি নতুন সংযোজন। ২০১৯ সালে সিডনি টেস্টে ভারতের কুলদীপ যাদব অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। তার আগে ২০১২ সালের হোবার্ট টেস্টে শ্রীলঙ্কার রঙ্গনা হেরাথ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। হেরাথের বোলিং পরিসংখ্যান ছিল ৫/৯৫।
মিরাজের সাফল্যের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে তিনি ৬৫ রান করেন। ফলে ম্যাচজুড়ে তার অবদান ছিল দুই বিভাগেই কার্যকর। তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জয়ের ভিত আরও শক্ত করে।
তবে ম্যাচে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের আরেক বড় নায়ক ছিলেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে তিনি ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেন। ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচসেরার পুরস্কারও পান। তার দুর্দান্ত শুরু এবং মিরাজের দ্বিতীয় ইনিংসের স্পিন—দুইয়ে মিলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে পুরো ম্যাচজুড়েই চাপে রেখেছিল।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েও ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে সফরকারীরা অস্ট্রেলিয়ার ওপর ২২৮ রানের বড় লিড নেয়। তানজিদ হাসান করেন ১০১ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মুমিনুল হকের ৪৯ রানও দলের বড় সংগ্রহ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াকু ইনিংস স্বাগতিকদের কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে সেই প্রতিরোধ ভেঙে দেন। মিরাজ ৫ উইকেট নিয়ে মাঝের ও শেষের সারির ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ৫৭ রানের ছোট লক্ষ্যও বাংলাদেশকে তাড়া করতে হয়েছে মাত্র এক উইকেট হারিয়ে।
এই জয়ের পর নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করেছেন মিরাজ। ইতিহাসের অংশ হতে পেরে তিনি গর্বিত ও সম্মানিত—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনুভূতির কথাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলের এই অলরাউন্ডার।
ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে সাফল্যের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি আত্মবিশ্বাসের বড় ঘোষণা। আর সেই ঘোষণার কেন্দ্রে রয়েছেন মিরাজ—ব্যাট হাতে ৬৫ রান, বল হাতে পাঁচ উইকেট এবং ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখানোর মতো একটি স্মরণীয় টেস্ট পারফরম্যান্স নিয়ে।
মন্তব্য