৯৭ সালে শেখ হাসিনার ‘মহিলা বাস’ থেকে শুরু : এবার ‘পিংক বাসে’ নারীদের সংকটে নানা উদ্যোগ

গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বিশেষ নারী বাসসেবার ইতিহাস প্রায় তিন দশকের। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই বিশেষ বাসসেবা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে পৌঁছেছে ‘পিংক বাস’ যুগে।

বিআরটিসির (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন) বিভিন্ন উদ্যোগ, সরকারি অগ্রাধিকার কর্মসূচি এবং একাধিকবার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা সত্ত্বেও নারী বাসসেবা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বাসের স্বল্পতা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রচারণার ঘাটতি এবং লিজ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন সময়ে চালু হওয়া এই সেবা ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

১৯৯৭-৯৮: শেখ হাসিনার নির্দেশে ‘মহিলা বাস’

বাংলাদেশে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্যোগে কর্মজীবী নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি প্রথম পৃথক মহিলা বাসসেবা চালু করে।

এরপর ১৯৯৮ সালের শেষভাগে বা ১৯৯৯ সালে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ করতে আরও একটি বিশেষ বাসসেবা চালুর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ সে সময় নারী যাত্রীদের মধ্যে সাড়া ফেললেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে তা স্থায়ী রূপ পায়নি।

২০০৮ থেকে ২০২৪: বারবার ফিরেছে, টেকেনি

নারীদের বিশেষ বাসসেবা পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে বিআরটিসি বিভিন্ন সময়ে তা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। ২০০৮ সালের জুলাইয়ে মিরপুর-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও তালতলা-গুলিস্তান রুটে পাঁচটি বাস দিয়ে আবারও বিশেষ নারী বাসসেবা চালু করা হয়।

২০০৯ সালের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেবাটি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সাল নাগাদ সচল বাসের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত হয়। তবে এরপরও সেবাটি কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব পায়নি। ২০২৪ সালের শুরুতে বাসের সংখ্যা কমে সাত থেকে নয়টিতে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত প্রচারণা না থাকায় অনেক নারী যাত্রী জানতেন না কোথায়, কখন ও কোন রুটে এসব বাস চলাচল করে। ফলে অনেক সময় বাসগুলো যাত্রীস্বল্পতায় চলত এবং কোথাও কোথাও পুরুষ যাত্রী তুলে সেগুলোকে কার্যত সাধারণ বাসের মতো ব্যবহার করা হতো।

অন্যদিকে নিকট অতীতে ২০১৮ সালে ঢাকায় নারীদের জন্যে আলাদা বাস সার্ভিস ‘দোলনচাঁপা’ চালু করেছিল র‌্যাংগস গ্রুপ। ওটা ছিল দেশে প্রথম কোন ‘বেসরকারি মহিলা বাস সার্ভিস’। র‌্যাংগস গ্রুপের মালিকের মেয়ে সোহানা চৌধুরী এ বাস সার্ভিসের ছিলেন মূল উদ্যোক্তা।

বাসগুলো ছিল ৩৬ সিটের। আইচার কোম্পানির তৈরি ওই বাসে ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা, ছিল ফাস্ট এইড বক্স-সহ প্রতিবন্ধীদের বাসে উঠার সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় উপকরণ।

বেসরকারি ওই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

এতে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালুর মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হয়। শুধু বাস নামিয়ে দিলেই নারী-বান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করা যায় না, সেটি বারবার স্পষ্ট হয়েছে বিগত তিন দশকের অভিজ্ঞতায়।

২০২৬: ‘পিংক বাসে’ নতুন অধ্যায়

আগের উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট বিআরটিসি নারীদের জন্য নতুন আঙ্গিকে ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালু করেছে। এবার শুধু বাসের রং পরিবর্তন নয়, পরিচালন ব্যবস্থাতেও আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত এই পিংক বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর। প্রথমবারের মতো বিশেষ এই সেবায় নারী চালকদের প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৬ জন নারী চালককে এ কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

নতুন সেবায় মোট ১৪টি গোলাপি রঙের দোতলা বাস যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটে ১০টি, বগুড়ায় দুটি এবং চট্টগ্রামে দুটি বাস চলবে।

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন বাজার-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা-জিপিও, মিরপুর-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল, গাজীপুর-বিমানবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা। বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে বাস চলবে।

এবার কতটা বদলাবে চিত্র?

প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতা। নতুন বাস চালু হলেও পর্যাপ্ত যানবাহন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সময়সূচি প্রকাশ, প্রচারণা, রুট ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির ঘাটতি থাকলে কয়েক বছর পর আবারও একই সংকট তৈরি হতে পারে।

লিজ ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যকর সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং নারী চালক-কন্ডাক্টর নিয়োগ এবারের উদ্যোগকে আগেরগুলোর তুলনায় আলাদা করেছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছে সেবাটি পরিচিত করা এবং নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি কঠোরভাবে অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি গণপরিবহনে হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও নিরাপত্তাহীনতা কমানোর লক্ষ্যেই নতুন ‘পিংক বাস’ চালু করা হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, প্রায় তিন দশকের নানা উদ্যোগের পর এবার এই সেবা কতটা টেকসই ও কার্যকরভাবে চালু রাখা যায়।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।