ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের করুণ মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী এবং একটি শিশু রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এবং উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে থেকে কলকাতায় গিয়ে ওই আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছিলেন তারা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিবাগত রাত দুইটার কিছু আগে বহুতল ভবনটিতে আকস্মিক আগুন লেগে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ওই সময় আগুনে আটকে পড়েও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন কয়েকজন বাংলাদেশি। তারা সেই রাতের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
ব্যবসায়িক কাজে কলকাতা গিয়ে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনের চতুর্থ তলার হোটেলে নিজের ছোট ভাইসহ অবস্থান করছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আশরাফুল জামাল। ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, গভীর রাতে হঠাৎ চারদিকের বিকট চিৎকার-চেঁচামেচি ও আর্তনাদে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। ঘরের জানালা খুলে নিচে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখে তারা দ্রুত বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন।
আশরাফুল জামাল বলেন, “ঘরের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত ঘন কালো ধোঁয়া ঘরে ঢুকে পড়ে। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়ায় নিচে নামার কোনো উপায় ছিল না। কোনো মতে ধোঁয়ার মধ্যে পথ খুঁজে নিয়ে ওই তলার প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন আবাসিক বোর্ডার ভবনের ছাদে উঠে যাই এবং ছাদের পানির ট্যাঙ্কের পাশে আশ্রয় নিই। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, আর পেছনের দিক থেকে আগুন কখন চলে আসে সেই আতঙ্কে ছিলাম। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় আমরা সেখানেই কাঁপছিলাম।”
একই ধরনের প্রাণপণ লড়াই ও চরম আতঙ্কের অভিজ্ঞতার কথা জানান হৃদ্রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাজমুল সরকার। জীবনের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “একটা সময় মনে হচ্ছিল ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আমরা হয়তো মারাই যাব। প্রচণ্ড অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছিল, নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না। হোটেলের লোকজন আমাদের ওপরে উঠতে বললেও সিঁড়িটা ছিল লোহার তৈরি ও অত্যন্ত সরু, যেখানে একে একে উঠতে হচ্ছিল। পুরোটা জায়গা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ায় এক হাত দূরের জিনিসও দৃশ্যমান ছিল না। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনোমতে আমরা ছাদে উঠে যাই।”
অগ্নিদগ্ধ ভবনটিতে অবস্থানরত অনেক বোর্ডার অভিযোগ তুলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূমিকা দায়িত্বশীল ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে বোর্ডারদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা সতর্কতামূলক সরঞ্জাম ওই হোটেলে ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
তবে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা জানান কাউসার হোসেন নামের এক বাংলাদেশি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই ভবনের নিচতলার একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। তিনি জানান, আগুন লাগার পর হোটেলের কর্মচারীরা দ্রুত এসে দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়ে তাদের ঘুম ভাঙান, যার ফলে তারা সময়মতো অক্ষত অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। অবশ্য তাড়াহুড়ো করে প্রাণ বাঁচিয়ে বের হতে গিয়ে পাসপোর্ট ও মূল্যবান কাগজপত্র ঘরেই ফেলে আসেন তারা। পরবর্তীতে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে সেসব উদ্ধার করতে আবারও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কলকাতা ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করে। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ অনুসন্ধানে স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে।

