কোপা লিবার্তাদোরেসের শেষ ষোলো থেকে রোজারিও সেন্ট্রালের বিদায়ের পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা আনহেল দি মারিয়া। করিন্থিয়ানসের কাছে ১-০ গোলে হেরে মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাওয়ার পর তাঁর কথায় ফুটে উঠেছে দীর্ঘ ফুটবলজীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে অনিশ্চয়তা।
বৃহস্পতিবার ব্রাজিলের সাও পাওলোয় করিন্থিয়ানসের মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচে রোজারিও সেন্ট্রালকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় স্বাগতিক দল। প্রথম লেগে দুই দল গোলশূন্য ড্র করেছিল। ফলে দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটিই হয়ে ওঠে শেষ আটে ওঠার নির্ধারক লড়াই। রোজারিওর জন্য সেই ম্যাচের ফল ছিল হতাশার, আর ৩৮ বছর বয়সী দি মারিয়ার জন্য তা আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে।
কারণ, এই একই স্টেডিয়ামের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি স্মরণীয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে। প্রায় এক যুগ আগে আর্জেন্টিনার হয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। সেই গোলের পরই বিশ্বকাপজয়ের পথে আর্জেন্টিনার যাত্রা আরও এগিয়ে যায়। এবার একই মাঠে ক্লাবের হয়ে পরাজয় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ক্যারিয়ারের অন্য এক সন্ধিক্ষণে।
ম্যাচের পর সাক্ষাৎকারে দি মারিয়া নিজের হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, মুহূর্তটি তাঁর জন্য কঠিন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভিন্ন কিছু এবং তিনি খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তবে এখন সামনে কী করবেন, তা নিয়ে তাঁকে ভাবতে হবে।
করিন্থিয়ানসের বিপক্ষে রোজারিও সেন্ট্রাল লড়াই করলেও আক্রমণের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। দি মারিয়ার ভাষায়, দল গোল করার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু ম্যাচটি নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের একটি গোলই দুই দলের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
এই বিদায়ের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ রোজারিও সেন্ট্রালেই নিজের ফুটবলযাত্রা শুরু করেছিলেন দি মারিয়া। দীর্ঘ ১৮ বছর ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবে খেলার পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শৈশবের ক্লাবে ফিরে আসেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ, জুভেন্টাস ও বেনফিকার মতো ক্লাবে খেলে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম পরিচিত তারকায় পরিণত হন।
আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ। বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে মহাদেশীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নায়ক ছিলেন তিনি। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর গোলেই আর্জেন্টিনা দীর্ঘ অপেক্ষার পর বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালেও তিনি গোল করেন এবং আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রোজারিও সেন্ট্রালে ফেরার পরও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন দি মারিয়া। এ বছর কোপা লিবার্তাদোরেসের গ্রুপ পর্বে তিনি দুটি গোল করেছিলেন। প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রথম গোলটি এসেছিল পেনাল্টি থেকে, যা ছিল এই টুর্নামেন্টে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম গোলও। রোজারিও সেন্ট্রাল গ্রুপ পর্বে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে শেষ ষোলোতে উঠেছিল এবং ছয় ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছিল।
গত জুনে রোজারিও সেন্ট্রালের সঙ্গে দি মারিয়ার চুক্তি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় তাঁর বয়স হবে ৩৯ বছর। তবে নতুন চুক্তি থাকলেও অবসরের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
শৈশবের ক্লাবে ফেরার পর থেকে দি মারিয়া আবারও রোজারিওর অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। দেওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রত্যাবর্তনের পর ক্লাবটির হয়ে তিনি ৪৩ ম্যাচে ১৪ গোল করেছেন এবং সাতটি গোলে সহায়তা করেছেন। মাঠে তাঁর অভিজ্ঞতা, বাঁ পায়ের নিখুঁত পাস, সেট পিসে দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও দলের বড় সম্পদ।
তবে করিন্থিয়ানসের কাছে এই পরাজয়ের পর তাঁর বক্তব্যে অবসরের সম্ভাবনা যে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। চুক্তি অনুযায়ী তাঁর সামনে আরও একটি মৌসুম রয়েছে। কিন্তু ফুটবলজীবনের শেষ সিদ্ধান্ত কখন নেবেন, সেই উত্তর এখনো দেননি ‘ফিদেও’ নামে পরিচিত এই আর্জেন্টাইন তারকা।
দীর্ঘ ও সাফল্যময় ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দি মারিয়ার সামনে তাই দুটি পথ খোলা—আরও কিছুদিন রোজারিও সেন্ট্রালের জার্সিতে খেলা চালিয়ে যাওয়া, অথবা প্রত্যাশার আগেই প্রিয় ক্লাবের হয়ে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানা। আপাতত তাঁর নিজের কথাতেই স্পষ্ট, সিদ্ধান্তটি নিয়ে তাঁকে খুব শিগগিরই ভাবতে হবে।


