মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুই যুবককে আটকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই নেতার বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সড়কে স্লোগান দেওয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বহিষ্কৃত আলমাছ মিয়া কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির জয়চন্ডী ইউনিয়ন কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি জয়চন্ডী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
শনিবার জয়চন্ডী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোহিতুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আলমাছ মিয়াকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলের শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং নীতি, আদর্শ ও সাংগঠনিক সংহতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় তাঁকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পর্যায়ের পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মী, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া পৌরসভার প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী অটোরিকশা স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। সড়কের পাশে যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে নিয়মিত যানজট তৈরি হচ্ছে। এতে পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
যানজট কমাতে গত ১৩ আগস্ট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শহরের ছয়টি নির্ধারিত স্থানে দুটি করে অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৬ আগস্টের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের বলা হয়েছিল। নির্দেশনা কার্যকর না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
এরপর ১৯ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাসের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত কুলাউড়া শহরে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড় করানোর দায়ে এক চালককে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই অভিযানে একটি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের ব্যবস্থাপক ও তিন চালককে মোট পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এই অভিযানের পর ক্ষুব্ধ হয়ে আলমাছ মিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন অটোরিকশাচালক সড়কে গাড়ি এলোমেলোভাবে রেখে অবরোধ তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তাঁরা সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। খবর পেয়ে উপজেলা বিএনপির নেতারা ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
এর মধ্যেই আলমাছ মিয়ার বিরুদ্ধে দুই যুবককে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসে। সম্প্রতি অটোরিকশা চুরির অভিযোগে ওই দুই যুবককে আটক করে একটি কক্ষে মারধর করা হয়েছে—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় চার মিনিট ২৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দুই যুবককে বেল্ট দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়। ভিডিওতে আলমাছ মিয়াসহ আরেক ব্যক্তিকে তাঁদের ওপর নির্যাতন করতে দেখা গেছে। দুই যুবক বারবার পায়ে ধরেও রেহাই পাচ্ছিলেন না। তাঁদের কাছ থেকে অটোরিকশা চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছিল বলেও ভিডিওতে দেখা যায়।
জয়চন্ডী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, রাস্তা বন্ধ করে সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ভাষায় স্লোগান দেওয়া এবং চুরির অভিযোগে দুই যুবককে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগ—দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আলমাছ মিয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কুলাউড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখেছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগের বিষয়টি পুলিশ নিজ উদ্যোগে খতিয়ে দেখছে এবং নির্যাতনের শিকার দুই যুবককে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
আলমাছ মিয়ার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে দুই দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁর স্ত্রী ফোন ধরে জানান, আলমাছ ঘুমিয়ে আছেন এবং ঘুম থেকে ওঠার পর তিনি কথা বলবেন।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, সড়কে শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগতভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কোনো চুরির অভিযোগ উঠলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক বা নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে ভিডিওটির সত্যতা, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং দুই যুবকের অবস্থান সম্পর্কে তদন্তের ফলাফল এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



