অভিনন্দন -শুভ জন্মদিন তসলিমা নাসরিন

বিতর্ক, দ্রোহ, প্রেম, প্রথাবিরোধিতা আর মুক্তচিন্তার সাহসী উচ্চারণে বাংলা সাহিত্যে যে কজন লেখক নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ভূবন নির্মাণ করেছেন, তসলিমা নাসরিন তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন কবি, ঔপন্যাসিক কিংবা প্রাবন্ধিক নন-তিনি বাংলা সাহিত্যের এক আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম; একসঙ্গে যাঁর কলমে উচ্চারিত হয়েছে নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা এবং সমাজের প্রচলিত শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

আজ২৫আগস্ট-
তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন।

১৯৬২ সালের এই দিনে ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় তসলিমার ডাকনাম ‘তনা’-যে নামটি দিয়েছিলেন প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ।

পিতা রজব আলী ছিলেন চিকিৎসক এবং মাতা ঈদুল ওয়ারা গৃহিণী। ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে ১৯৭৬ সালে এসএসসি এবং আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাস করার পর তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালেই বেড়ে উঠছিল আরেক পরিচয়-একজন কবির পরিচয়।

মাত্র তেরো বছর বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন তসলিমা। কলেজজীবনে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন সাহিত্যপত্র ‘সেঁজুতি’। তাঁর কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’। এরপর একে একে আসে ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’, ‘আমার কিছু যায় আসে না’, ‘অতলে অন্তরীণ’, ‘বালিকার গোল্লাছুট’ ও ‘বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা’-যেখানে প্রেমের পাশাপাশি ফুটে ওঠে নারীজীবনের বঞ্চনা, একাকিত্ব, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের স্বর।

নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখালেখি আরও তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। নারী অধিকার, বৈষম্য ও ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা নিয়ে তাঁর কলাম ও প্রবন্ধ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ‘নির্বাচিত কলাম’-এর জন্য ১৯৯২ সালে তিনি লাভ করেন আনন্দ পুরস্কার।

এরপর প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস প্রকাশের পর তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে, তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয় এবং তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়।

একজন লেখকের জন্য নির্বাসন যতটা ভৌগোলিক, তার চেয়েও বেশি তা মানসিক। তসলিমার জীবনেও সেই নির্বাসন দীর্ঘ হয়েছে। নিজের ভাষা, সমাজ ও শিকড় থেকে দূরে থেকেও তিনি লেখনী থামাননি। বরং নির্বাসনের দীর্ঘ পথকে পরিণত করেছেন তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরেক অধ্যায়ে।

তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনাগুলোতেও ব্যক্তিগত জীবন, নারীজীবন, সমাজ, ধর্ম, যৌনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন উঠে এসেছে তীব্র ও অকপট ভাষায়। এসব রচনার কয়েকটি বাংলাদেশ ও ভারতে নিষিদ্ধও হয়েছে। বিতর্ক তাঁকে যেমন তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি করেছে, তেমনি এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি।

তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে মতভেদ আছে-
তীব্র সমালোচনাও আছে, প্রবল সমর্থনও আছে। কেউ তাঁকে নারীমুক্তি ও মুক্তচিন্তার সাহসী কণ্ঠ মনে করেন, কেউ তাঁর ভাষা ও বক্তব্যের সঙ্গে গভীরভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন-তাঁর কলম বাংলা ভাষার সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় একটি প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

তিনি বিশ্বাস করেন প্রশ্ন করার অধিকারে, নিজের কথা বলার স্বাধীনতায়, নারীর সমান মর্যাদায়। তাঁর লেখার সঙ্গে একমত হওয়া বা না-হওয়া পাঠকের নিজস্ব স্বাধীনতা; কিন্তু তাঁর লেখার কারণে যে বিতর্ক, আলোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে উপেক্ষা করার মতো নয়।

তসলিমা নাসরিন—একটি নাম, একটি বিতর্ক, একটি দ্রোহী কলম;
কখনো প্রেমের কবিতা, কখনো প্রতিবাদের ভাষা,
কখনো নিঃসঙ্গ নির্বাসনের দীর্ঘশ্বাস।

জন্মদিনে এই বিতর্কিত অথচ বহুল আলোচিত লেখিকার প্রতি রইল শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

জীবনের দীর্ঘ নির্বাসন পেরিয়ে তাঁর কলমে ফিরে আসুক আরও গভীর মানবিকতা, আরও নির্মল সৃজনশীলতা এবং মানুষের প্রতি আরও অগাধ ভালোবাসা।

শুভ জন্মদিন, তসলিমা নাসরিন।
দ্রোহের কলমে জেগে থাকুক সাহস,
সৃষ্টির আলোয় উজ্জ্বল হোক আগামী দিন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।