রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (আরপিএমপি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে বদলি করে তাঁর স্থলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে একই সঙ্গে পুলিশের আরও দুই কর্মকর্তার বদলির কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসবির ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আসলাম উদ্দিনকে পুলিশ সদর দপ্তরে টিআর পদে এবং নোয়াখালী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নূরুল আমীনকে খাগড়াছড়ি এপিবিএন ও বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়েছে।
রংপুরের শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মৃত্যুর আগে তাঁকে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ এবং ময়নাতদন্তসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
গোপন ক্যামেরায় ডোমের বক্তব্য
আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার আগে যৌন নির্যাতনের শিকার করা হয়েছিল কি না, এ প্রশ্নের সূত্রপাত ঘটে একাত্তর টেলিভিশনের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনকে কেন্দ্র করে। ওই কথোপকথনে ময়নাতদন্তে সহযোগিতাকারী হিসেবে পরিচিত এক ডোমকে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত থাকার ইঙ্গিত দিতে শোনা যায়।
গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ওই কথোপকথনে ডোম বলেন, আগামী চক্রবর্তীর যোনিপথ থেকে বীর্য বের হওয়ার কথা তিনি জানতে পেরেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসকের রিপোর্টে যা লেখা থাকবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বলতে হবে। চিকিৎসকের রিপোর্টের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের অমিল হলে বিষয়টি জটিল হতে পারে বলেও তাঁকে বলতে শোনা যায়।
ডোমের ভাষ্যে, এ বিষয়ে নিহত পরিবারের পক্ষ থেকেও কিছু কথা বলা হয়েছিল। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে বলা যাবে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ঢাকায় থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং ম্যাজিস্ট্রেট আসার কথা রয়েছে।
তবে ডোমের বক্তব্যকে চূড়ান্ত চিকিৎসা বা ফরেনসিক প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তির মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন নিশ্চিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, শরীর থেকে সংগ্রহ করা নমুনার ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের প্রাথমিক বয়ানে ধর্ষণের তথ্য ছিল না
চারজনকে হত্যার পর ২৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরেছিলেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই যুবককে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করে। এরপর তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ আরও দাবি করে, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয় বলেও পুলিশ জানায়।
এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। পরে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি থানা-পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়।
তবে পুলিশের ওই প্রাথমিক বয়ানে আগামী চক্রবর্তীকে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ময়নাতদন্তের তথ্যেও প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। তবে আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
এই বক্তব্য পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করে। পুলিশের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে টানার কারণে তাঁর চোখ বেরিয়ে আসে এবং চোয়াল ভেঙে যায়।
কিন্তু ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর চোয়াল ভাঙার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে আগামী চক্রবর্তীর মৃত্যুর সময় কী ধরনের শারীরিক আঘাত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
মরদেহের মুখের কাছে থাকা তরল পদার্থ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, সেটি কোনো রাসায়নিক বা অ্যাসিডের কারণে হয়েছে বলে মনে হয়নি; বরং মরদেহে পচন ধরার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও চিকিৎসক জানিয়েছিলেন।
ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়
আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার আগে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো চিকিৎসা বা ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ডোমের বক্তব্যকে এককভাবে ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শরীরে কোনো তরল বা জৈবিক উপাদান পাওয়া গেলেই সেটিকে ধর্ষণের প্রমাণ বলা যায় না। সেই উপাদানের উৎস কী, সেখানে কার ডিএনএ রয়েছে, নমুনাটি কীভাবে শরীরে এসেছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়।
তবে ডোমের বক্তব্য সামনে আসায় ময়নাতদন্তে আগামী চক্রবর্তীর শরীর থেকে কী ধরনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং সেগুলোর পরীক্ষার ফল কী এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হত্যার কারণ নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য
চারজনকে হত্যার কারণ নিয়েও পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি ভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
অন্যদিকে নিহত পরিবারের স্বজনদের পক্ষ থেকে এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির বিরোধের অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে সামনে আসা এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। মামলার তদন্তে কোন অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিই চূড়ান্তভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক


