বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেটের জয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। বাংলাদেশের দাপুটে পারফরম্যান্সে তিনি যেমন সন্তুষ্ট, তেমনি এই ফলকে নিজের দেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখছেন। তাঁর মতে, শক্তিশালী দলকে হারানোর মতো সামর্থ্য বাংলাদেশের মতো দলগুলোর মধ্যে রয়েছে—আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম শক্তি।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় এসেছে টানা ১১ সেশন নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পর। ৯ উইকেটের এই জয় তাই কেবল ব্যবধানের কারণে নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণের কারণেও তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার পরিধি নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে ওয়াহর প্রতিক্রিয়া ছিল উচ্ছ্বসিত। তিনি মনে করেন, এমন ফল অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় সতর্কসংকেত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো করা তাঁকে আনন্দিত করেছে। তাঁর দৃষ্টিতে, টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর পাশাপাশি নতুন ও অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দলগুলোও যদি নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, তাহলে দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটের আকর্ষণ বাড়বে।
তবে বাংলাদেশের জয় নিয়ে কথা বলার পরই ওয়াহর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু চলে যায় টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যতের দিকে। তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অর্থনীতি। আধুনিক ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার বিস্তার খেলোয়াড়দের সামনে দ্রুত ও তুলনামূলক বেশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। একজন ক্রিকেটারের জন্য কয়েক সপ্তাহের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করা অনেক সময় দীর্ঘ সময়ের টেস্ট সূচিতে ব্যস্ত থাকার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াহ তাই টি-টোয়েন্টিকে বেছে নেওয়া ক্রিকেটারদের সমালোচনা করতে চান না। তাঁর যুক্তি, খেলোয়াড়দেরও জীবিকা ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। যদি একটি সংস্করণে কম সময়ে বেশি আয় করার সুযোগ থাকে, তাহলে সেই সুযোগ নেওয়া একজন পেশাদার ক্রিকেটারের কাছে অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে টেস্ট ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব অন্য জায়গায়। ওয়াহর মতে, এ ক্ষেত্রে ক্রিকেট প্রশাসকদের আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু খেলোয়াড়দের টেস্ট খেলার প্রতি আনুগত্যের কথা বললে হবে না; দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সেটি একজন ক্রিকেটারের কাছে সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য ক্যারিয়ারও হয়।
এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আলাদা সময় রাখার কথা বলেছেন ওয়াহ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচিতে টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে ও টেস্টকে একই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক চাপের মধ্যে রাখলে দীর্ঘ সংস্করণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই টেস্টের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ এবং সেই সময়কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচিতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অবশ্য এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জটিলতাও তিনি স্বীকার করেছেন। আন্তর্জাতিক সিরিজের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট, ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতা এবং ক্রিকেটারদের বিশ্রামের বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে টেস্টের জন্য আলাদা সময় বের করা সহজ নয়। কিন্তু ওয়াহর বক্তব্যে স্পষ্ট, কঠিন হলেও বিষয়টি নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করা দরকার।
টেস্ট ক্রিকেটের পারিশ্রমিক নিয়েও ওয়াহর বক্তব্য দীর্ঘদিনের। ১৯৯৯ সালে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, টেস্ট ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। প্রায় ২৭ বছর পরও তিনি মনে করেন, সেই ধারণার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি।
তাঁর যুক্তি হলো, বাংলাদেশের কিংবা শ্রীলঙ্কার একজন ক্রিকেটার দেশের হয়ে টেস্ট খেললে তাঁর পারিশ্রমিক যেন ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার একজন টেস্ট ক্রিকেটারের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম না হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো গেলে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের দেশের ক্রিকেটারদের কাছেও টেস্ট ক্রিকেট দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াহর উদ্বেগ শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। খেলার ধরনও তাঁর চিন্তার কারণ। তাঁর মতে, টেস্ট ক্রিকেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সৌন্দর্য হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষমতা। সব সময় দ্রুত রান করা কিংবা দর্শককে আনন্দ দেওয়ার মতো আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হয় না। কখনো কখনো দলের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান ইনিংস হতে পারে এমন একটি ইনিংস, যেখানে ব্যাটসম্যান দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে প্রতিপক্ষের বোলারদের ক্লান্ত করে দেন।
পরপর কয়েকটি মেডেন ওভার খেলা, রান না পেলেও উইকেট আগলে রাখা, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে ব্যাট করা—এসব দক্ষতাকে ওয়াহ টেস্ট ক্রিকেটের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, আধুনিক ক্রিকেটের দ্রুতগতির সংস্কৃতিতে এই মানসিকতা কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে।
টি-টোয়েন্টির প্রভাব ক্রিকেটারদের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন এনেছে। দ্রুত রান করা, কম বলে বেশি প্রভাব তৈরি করা এবং আক্রমণাত্মক ক্রিকেট এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। এই মানসিকতা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কার্যকর হলেও টেস্টে সব সময় একইভাবে কাজ করে না। পাঁচ দিনের ম্যাচে কখন আক্রমণ করতে হবে এবং কখন শুধু উইকেটে টিকে থাকতে হবে—এই পার্থক্য বুঝতে হয়।
ওয়াহ মনে করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সেই ক্রিকেটীয় শিল্প নতুন প্রজন্মকে আবার শেখানো প্রয়োজন। কারণ টেস্টে একটি দল কখনো কখনো পুরো সেশন শুধু উইকেট বাঁচিয়ে কাটিয়ে দিয়ে পরের সেশনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতাই দীর্ঘ সংস্করণকে অন্য দুই সংস্করণ থেকে আলাদা করে।
নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই ওয়াহ এসব কথা বলছেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৫৭টি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে তিনি ৪১টি জয় পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বের সময় অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিল। ফলে টেস্ট ক্রিকেটের কৌশল, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের মূল্য তিনি মাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন।
বাংলাদেশের ডারউইন জয় তাই ওয়াহর কাছে একই সঙ্গে আনন্দ ও সতর্কতার বার্তা। বাংলাদেশের মতো দলের শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানো প্রমাণ করে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা এখনো যথেষ্ট। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক সূচি এবং খেলোয়াড়দের প্রণোদনা—তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দরকার।
ওয়াহর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সরল ধারণা—টেস্ট ক্রিকেটে একজন খেলোয়াড়ের প্রকৃত সামর্থ্য যাচাইয়ের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এখানে শুধু প্রতিভা নয়, ধৈর্য, কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘ সময় চাপ সামলানোর ক্ষমতাও পরীক্ষা হয়। তাই এই সংস্করণকে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু একটি পুরোনো ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য ধরে রাখা নয়; ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রটিকেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত রাখা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য সেই সম্ভাবনাই নতুন করে সামনে এনেছে। এখন প্রশ্ন, ক্রিকেট প্রশাসন সেই প্রতিযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারে কি না। ওয়াহর উদ্বেগের মূল জায়গাটিও সেখানেই।


