পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকার একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ একাধিক অপরাধে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মোবারক ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। সেখানে তাঁকে ধরতে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও সফলতা আসেনি। পরে পাহাড়ি এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়লে তিনি ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাত তিনটার দিকে বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বাড়িটির দরজা ছিল লোহার তৈরি। দীর্ঘ সময় ধরে দরজা খোলার জন্য বলা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ভোর সাড়ে চারটার দিকে দরজা ভেঙে পুলিশ বাড়িতে প্রবেশ করে।
অভিযানকারী দল বাড়ির ভেতরে প্রবেশের পর ওয়াশরুমের ওপরের ফলস ছাদে মোবারকের তিন সহযোগীকে খুঁজে পায়। একে একে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁরা হলেন মো. রায়হান, মো. ফরিদ ও মো. নাছির। তাঁদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, পিস্তলের ২৩টি গুলি এবং শটগানের চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়।
এরপর একটি কক্ষের ওয়াশরুমের ফলস ছাদে মোবারকের অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। অভিযানের সদস্যরা কক্ষে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক পরপর ছয়টি গুলি করেন। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশের দাবি, মোবারক সপ্তমবার গুলি করার চেষ্টা করলে তাঁর অস্ত্রটি আটকে যায়। সেই সুযোগে পুলিশ তাঁকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি পরীক্ষা করে পুলিশ জানতে পারে, অস্ত্রটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র।
অভিযানে আহত পাঁচ পুলিশ সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ, ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আলম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেহরক্ষী পুলিশ সদস্য মামুনুর রশিদ এবং ফটিকছড়ি থানার পুলিশ সদস্য শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, মোবারককে গ্রেপ্তারের পর ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়। পুলিশ বলছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতেন মোবারক। এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে সত্যতা নির্ধারিত হবে।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, অস্ত্র লুট ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা পৃথক দুই মামলায় মোবারককে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করা হয়। পরে আদালত দুই মামলায় চার দিন করে মোট আট দিনের হেফাজত মঞ্জুর করেন।
পুলিশের এই অভিযানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা মোবারক গ্রেপ্তার হওয়ায় ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এর আগে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।


