ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করার বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ফিফার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের ২০ শতাংশ মালিকানা ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রির উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই মূল বিরোধের সূত্রপাত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন জানিয়েছে, অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনা তৈরির সময় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে উয়েফা। সংস্থাটির দাবি, ফিফার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
উয়েফার আরও অভিযোগ, এফএফইর ২০ শতাংশ অংশীদারত্বের জন্য ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্ভাব্য প্রভাব থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচারও শুরু হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি আদালতে সম্ভাব্য প্রমাণ সংগ্রহের আবেদন করেছে উয়েফা। আদালতে দেওয়া আবেদনের লক্ষ্য ছিল এফএফইতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি থ্রাইভ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট নথি ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা।
উয়েফার দাখিল করা ৬০ পৃষ্ঠার নথিতে এফএফইর অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনা, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফিফার উত্তর আমেরিকার সদর দপ্তর, থ্রাইভ ক্যাপিটাল, জেপি মরগান এবং ব্যান ভেঞ্চারসের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ মাফেইর কাছ থেকেও নথি চাওয়া হয়েছে।
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে উয়েফার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ইনফান্তিনো এবং ফিফার আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুইস আইনের ১৫৮ ধারায় ফৌজদারি অব্যবস্থাপনার অভিযোগে মামলা করার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন। অভিযোগের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হতে পারে।
এফএফইর অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনাটি মূলত ফিফার বড় বাণিজ্যিক সম্পদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল। বিশ্বকাপসহ ফিফা আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় এবং অধিকার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর ২০ শতাংশ মালিকানা ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।
এই উদ্যোগে থ্রাইভ ক্যাপিটালসহ জশুয়া কুশনারের নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল। কিন্তু প্রস্তাবটি সামনে আসার পর থেকেই বিশ্ব ফুটবলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এর বিরোধিতা করে। উয়েফার পাশাপাশি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও এ পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানায়।
বিরোধিতার মূল কারণ ছিল ফিফার বাণিজ্যিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থাগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার একপর্যায়ে উয়েফা ফিফা আয়োজিত কয়েকটি প্রতিযোগিতা বর্জনের হুমকিও দিয়েছিল। এর ফলে বিষয়টি শুধু আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রশাসনিক সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে।
চাপের মুখে গত ১ আগস্ট ইনফান্তিনো এফএফইর অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করেন। পরে ফিফার বাণিজ্যিক সম্পদে ভবিষ্যতে একই ধরনের অংশীদারত্ব বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হবে না—এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উয়েফা সাময়িকভাবে প্রতিযোগিতা বর্জনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে।
উয়েফা জানিয়েছে, আগামী মৌসুমে ইউরোপীয় দলগুলোর ফিফা আয়োজিত কয়েকটি প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ এবং নারী অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ।
তবে উয়েফা স্পষ্ট করেছে, পরিস্থিতি তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজন হলে প্রতিযোগিতা বর্জনের অবস্থান আবারও বিবেচনা করা হতে পারে। ফলে এফএফইর অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্ক আপাতত থেমে গেলেও ফিফা ও উয়েফার মধ্যে আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপে রূপ নেয়নি। আদালতে জমা দেওয়া নথি এবং সম্ভাব্য প্রমাণ পর্যালোচনার পর উয়েফা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে তদন্ত, নথি সংগ্রহ এবং আইনি মূল্যায়নের ওপর।


