বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর গত ছয় মাসে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সারা দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা তীব্র লোডশেডিং এবং চরম গ্যাস সংকটে একদিকে যেমন জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎপাদন। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
বিগত বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের এই দৈন্যদশা দেখা যায়নি বলে মনে করছেন দেশের ভুক্তভোগীরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে চলমান এই পরিস্থিতির পেছনে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ এবং অতীতের সরকারের ভুল ও একমুখী নীতির ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তবে সরকারের এমন যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি কিংবা অতীতের ভুল নীতির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবও এই তীব্র সংকটের পেছনে সমানভাবে দায়ী।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশেই লোডশেডিংয়ের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলেই একপর্যায়ে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এর আগে চলতি বছরের ১০ই আগস্ট সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতির ভয়াবহ রূপটি তুলে ধরে। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন চরম আকার ধারণ করেছে, তেমনি উৎপাদন খাতের ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে।
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গিয়ে তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ মনে করেন, এত অল্প সময় কোনো গভীর সংকট স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও সদিচ্ছা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, গত ছয় মাসে ব্যবস্থাপনাগত বিষয়ে কোনো গুরুত্ব চোখে পড়েনি এবং ইতিবাচক কোনো রূপান্তরের চেষ্টা দৃশ্যমান নয়। সঠিক উদ্যোগ নেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট কিছু দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একইভাবে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ। তিনি জানান, ২০৩১ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কমানোর কোনো স্বল্পমেয়াদি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ দেখা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে পাওয়ার সেল বা বিদ্যুৎ মন্ত্রাণালয়ের মতো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জরুরি পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণার অভাব রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিত তাৎক্ষণিক কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।


