খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
সহিংসতা, দারিদ্র্য ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত আফ্রিকার দেশ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ইরানিসহ বেশ কিছু দেশের অভিবাসীকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আইনি জটিলতার কারণে যেসব অভিবাসীকে সরাসরি তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন আইনজীবী এবং এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ‘তৃতীয় দেশ’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত ও আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসীদের গ্রহণ করতে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সম্মত হয়েছে। তবে এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
এই নির্বাসন তালিকায় এমন দুজন ইরানি নারী রয়েছেন, যাঁরা নিজ দেশে ফেরত গেলে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও চরম নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাঁদের আইনজীবী এমিলি ট্রোসল জানিয়েছেন, এই দুই নারীর মধ্যে একজন ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন এবং অন্যজন একজন সক্রিয় গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকর্মী। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরপরই এই দুই নারীকে আটক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি মার্কিন অভিবাসন আদালত তাঁদের ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ (Withholding of Removal) নামক এক বিশেষ ধরনের আইনি সুরক্ষা প্রদান করে।
মার্কিন অভিবাসন আইন অনুযায়ী, এই সুরক্ষা পাওয়ার অর্থ হলো—সংশ্লিষ্ট আদালত এটি নিশ্চিতভাবে মনে করে যে, এই ব্যক্তিদের যদি তাঁদের নিজ দেশে (এক্ষেত্রে ইরান) ফেরত পাঠানো হয়, তবে সেখানে তাঁদের নিপীড়ন, নির্যাতন বা জীবননাশের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের চেয়েও বেশি। আইনজীবীদের আশঙ্কা, সুরক্ষাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের এমন একটি তৃতীয় দেশে পাঠানো হচ্ছে, যা তাঁদের জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর নজর রাখা একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চুক্তির অধীনে প্রথম চার্টার্ড ফ্লাইটে করে প্রায় ২০ জন অভিবাসীকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রথম দফার এই তালিকায় ইরান ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। দুই মার্কিন আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ ফ্লাইটটি গত বৃহস্পতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। এছাড়া রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসা এবং মার্কিন আদালতে একই ধরনের আইনি সুরক্ষা পাওয়া একজন তুর্কি নাগরিকও এই প্রথম ফ্লাইটে থাকতে পারেন বলে তাঁর আইনজীবী ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে পেশাগত নিরাপত্তার স্বার্থে এই আইনজীবী নিজের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পরিধি বেশ বড় এবং এর অধীনে পর্যায়ক্রমে শত শত অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে নির্বাসিত করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা দপ্তর (ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি) গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্বাসিত ব্যক্তিদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সব ধরনের যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও আইনি জটিলতায় পড়া অভিবাসীদের জন্য মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ‘তৃতীয় দেশে’ নির্বাসন সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন করেছিল, যেখানে বর্তমানে মারাত্মক ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপ চলছে। ওয়াশিংটন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের চুক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং অভিবাসন সংকট মোকাবিলার অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও অভিবাসী আইনজীবীরা বলছেন, এই চুক্তির বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট দিকগুলো এখনো সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ায় নির্বাসিত হওয়া ব্যক্তিদের শেষ পর্যন্ত এক প্রকার বাধ্য হয়ে পুনরায় নিজেদের বিপজ্জনক নিজ দেশেই ফিরে যেতে হতে পারে।
এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে। বর্তমানে দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনা চলমান রয়েছে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডের ভারপ্রাপ্ত আইনি পরিচালক আলী রাহনামা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সাধারণ জনগণকে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, এমন একটি সময়ে সেই একই শাসনব্যবস্থা ও নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে আসা ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের তারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
চুক্তির বিবরণী সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাসিত এই ব্যক্তিদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ের বিভিন্ন আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে সাময়িকভাবে রাখা হবে এবং তাঁদের অবিলম্বে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে বাঙ্গুইয়ে পৌঁছানো অভিবাসীদের সেখানে নামার পর প্রাথমিক ‘মানবিক সহায়তা’ দেবে তাদের সংস্থা। তবে আইওএম (IOM) এই নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নয়। সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে এবং কেবল স্বেচ্ছামূলক ভিত্তিতে এই মানবিক সহায়তা প্রদান করা হবে। উল্লেখ্য, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চলতি বছরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাকে ৮ কোটি ৫০ লাখ (৮৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকেই মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ক্রমাগত রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির প্রায় ৫৫ লাখ মানুষের সিংহভাগই এখনো চরম অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফস্তিন-আরশঞ্জ তুয়াদেরা গত বছর কয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে, যা রুশ ভাড়াটে সেনা (ওয়াগনার গ্রুপ), রুয়ান্ডার সরকারি বাহিনী এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর (MINUSCA) সমন্বিত অভিযানে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই বিদেশি সামরিক ও ভাড়াটে বাহিনীকে মূলত তুয়াদেরা সরকারকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং নিরাপত্তা সহায়তার জন্য দেশটিতে মোতায়েন করা হয়েছিল। এমন একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত রাষ্ট্র থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠানো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।