প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতার মাঝেই নেপালে ফুটে উঠেছে সামাজিক অপরাধের এক নির্মম ও অদ্ভুত চিত্র। হিমবাহ ধসে সৃষ্ট হঠাৎ বন্যা ও পাহাড় ধসে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা যখন লন্ডভন্ড, ঠিক তখনই উত্তাল নদীর স্রোতে ভেসে আসা একটি ব্যাংকের লকার ভেঙে টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, পানিতে ভেসে আসা এক নারীর লাশ থেকেও গহনা চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে।
স্থানীয় পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যায় রাসুয়া জেলার পাহাড়ি নদী ‘ভোটেকোশি’র পাহাড়ি ঢলে একটি ব্যাংকের বিশালাকার লোহার লকার ভেসে যায়। নদীর তীব্র স্রোত কাটিয়ে লকারটি পরবর্তীতে ধাদিং জেলার গালছি গ্রামীণ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেলখুখোলা এলাকায় ত্রিশূলী নদীর চরে এসে আটকে যায়।
নদীর তীরে বিশাল আকারের ওই ভল্ট বা লকারটি দেখতে পেয়ে স্থানীয় কিছু লোক সেটি ভেঙে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। ধাতব লকারটি ভেঙে ভেতরের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বের করে তা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া শুরু হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ধাদিং জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং তল্লাশি অভিযান চালায়।
পুলিশের প্রাথমিক অভিযানে ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মোট ২৯ জন অভিযুক্তকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তাদের তল্লাশি করে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৫ নেপালি রুপি, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৫ লাখ টাকার সমান। আটককৃত ব্যক্তিদের বয়স ১৯ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ধাদিং পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই স্থানীয় গালছি এলাকার মাস্তার গ্রামের বাসিন্দা। বাকিদের বাড়ি আদমঘাট, আদমতার এবং চিতওয়ান ও পারসা অঞ্চলে হলেও তারা বর্তমানে ধাদিংয়ে বসবাস করছিলেন। উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ আসলে কোন ব্যাংকের লকার থেকে এসেছে এবং এ চুরির ঘটনার পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী কে ছিল, তা বের করতে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে নেপাল পুলিশ।
লকার চুরির চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পাশাপাশি আরেক মর্মান্তিক অপরাধের চিত্রও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক মর্মান্তিক ভিডিওতে দেখা যায়, নারায়ণী নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে আসা অজ্ঞাত এক নারীর গলিত মরদেহ থেকে দুই ব্যক্তি সোনার কানের দুল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভিডিওটি নজরকাড়ার পরপরই অভিযুক্ত দুজনকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালের সার্বিক পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও সংকটজনক হয়ে উঠছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শনিবার তাদের সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, বন্যায় এ পর্যন্ত নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬য় জনে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা রাতারাতি লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪২৬ জনে, যা শুক্রবার রাত পর্যন্ত ছিল ১ হাজার ৯২৪ জন। তবে নিখোঁজ বিদেশি পর্যটক ও নাগরিকদের সংখ্যা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে; যার পরিমাণ প্রায় ৫১৭ জন।
পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে নেপালি সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলগুলো। দুর্যোগের এমন চরম মুহূর্তে দুষ্কৃতকারীদের এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেশটির সাধারণ মানুষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচণ্ড নিন্দার ঝড় তুলেছে।



