মাল্টি-ডাইমেনশনাল সংকটে দেশের বৃহৎ শিল্প: উৎপাদন সূচক প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক

গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি, আকাশছোঁয়া ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার মন্দা—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্প খাত। বছরের পর বছর ধরে চলা জ্বালানি অনিশ্চয়তার সঙ্গে চড়া সুদের হার ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে শিল্প উৎপাদনের গতি একেবারেই থামিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুলাই মাসের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক বা ইনডেক্স অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন (আইআইপি) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ০.৩৮ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ইতিবাচক ৬.২ শতাংশ। তারও আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.৬৫ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭.৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় ছিল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ৭ শতাংশেরও বেশি ইতিবাচক সূচক এভাবে ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে যাওয়াকে অর্থনীতিবিদরা বড় ধরনের বিপদের সংকেত হিসেবে দেখছেন।
শিল্পের এ স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ব্যাংক ঋণের চিত্রেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতিতেও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮.৫ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের সামান্য বেশি বাস্তবায়িত হয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগ বন্ধ থাকা এবং চলমান কারখানাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি খাতেই সংকটের মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত—যা দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি—সেখানেই জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যানুযায়ী, তাদের অন্তর্ভুক্ত ১,৮৫০টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৯০০টিই শুধু পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে নিটওয়্যার, ডাইং, ওয়াশিং ও স্পিনিং মিলগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। বিকেএমইএ জানিয়েছে, গ্যাস সংকটে ডাইং কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে অন্তত ৬০ শতাংশ কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে।
আশিল্পাঞ্চলের শৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার হিসাব মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত গাজীপুর, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান আটটি শিল্পাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ৭৫টি কারখানা। এর সরাসরি ফল হিসেবে কাজ হারিয়েছেন ১৭ হাজার ৮৫৬ জন শ্রমিক। শুধুমাত্র গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবই এসব কারখানা বন্ধের একক কারণ নয়; বিশ্ববাজার ও স্থানীয় বাজারে ক্রয়াদেশের ঘাটতি, মালিকদের তীব্র আর্থিক অনটন এবং ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংক ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে ১৫টি এবং পর্যাপ্ত কাজের অভাবে ২৩টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধের তালিকায় চলে গেছে। এছাড়া এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি দুর্ঘটনার পর থেকে তৈরি হওয়া তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের আরও ৩৩৯টি কারখানা মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যার মধ্যে ১৭টি কারখানা গ্যাস না পেয়ে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ শিল্পাঞ্চলে গত জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বন্ধ হওয়া কারখানা ও শ্রমিকের হিসাব:
শিল্পাঞ্চল বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা কাজ হারানো শ্রমিকের সংখ্যা
চট্টগ্রাম ২৬ ৭,৪৫০
গাজীপুর ১৭ ৪,১২০
আশুলিয়া ১৫ ৩,৬৫০
নারায়ণগঞ্জ ১,৪২০
ময়মনসিংহ ৪৫০
কুমিল্লা ও খুলনা ৭৬৬
সর্বমোট ৭৫ ১৭,৮৫৬
ভারী শিল্প খাতগুলোর মধ্যে গ্লাস প্রস্তুতকারকরা পড়েছে এক ভিন্নধর্মী বিপাকে। গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জিএমইএবি) মতে, বিক্রয়াদেশ কমলেও ফার্নেস বা গলানোর চুল্লি কোনোভাবেই বন্ধ করার উপায় নেই। ফলে সরকারি পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন বিপুল টাকার ডিজেল পুড়িয়ে ফার্নেস চালু রাখতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে।
রড ও স্টিল খাতেও একই হাহাকার। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলীহোসাইনের মতে, বর্তমানে তাদের উৎপাদন ও বিক্রি—দুটোই নিম্নমুখী। বায়েজিদ স্টিল, সালেহ স্টিল ও গোল্ডেন ইস্পাতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আর সীমা ও এইচএম স্টিলের মতো বড় বড় কারখানাগুলো তাদের মোট সক্ষমতার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদনে কোনোমতে টিকে রয়েছে। নির্মাণ খাতে মন্দা ও বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার কারণে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও তীব্র হচ্ছে।
সিরামিক খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে চড়া মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তব চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আবার ভারী সিমেন্ট শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মারাত্মক অবমূল্যায়ন (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা থেকে ১২২ টাকায় বৃদ্ধি) এই খাতের ঋণের বোঝাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশীয় অনেক সিমেন্ট কারখানা এখন দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম।
গাজীপুর ও আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ দিনের বড় একটি অংশ প্রায় শূন্যে নেমে আসছে। কারখানা সচল রাখতে গাজীপুরের এক ডাইং প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ঘণ্টায় শুধু গ্যাসের বিকল্প হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (SANEM) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, একে কেবল সাময়িক মন্দা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কাঁচামাল, জ্বালানি ও মূলধনি যন্ত্রপাতির চরম আমদানিনির্ভরতার মধ্যে সুদের উচ্চহার ও নীতিগত অনিশ্চয়তা দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে একদম গোড়া থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল করা এবং শিল্পে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করার জোরালো পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।