“একবার যেতে দে না আমার
ছোট্ট সোনার গাঁয়…”
কিছু গান শুধু গান নয়—সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির হৃদয়ের ভাষা। কিছু গীতিকারের লেখা শুধু শব্দের মালা নয়—তা হয়ে ওঠে মানুষের ভালোবাসা, দেশপ্রেম, স্বপ্ন, বিরহ ও শেকড়ের সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্কের প্রকাশ। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন তেমনই একজন সৃষ্টিশীল মানুষ; যাঁর কলমে বাংলা গান পেয়েছে অসংখ্য অমর পঙ্ক্তি।
১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও কাহিনিকার হিসেবে।
তাঁর কলমের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। স্বাধীনতা, স্বদেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর অসংখ্য গানের মূল সুর। তাঁর লেখা গান শুনলে মনে হয়—কবি যেন মানুষের হৃদয়ের ভেতর থেকেই শব্দগুলো তুলে এনেছেন।
“একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়…”
এই একটি পঙ্ক্তিতেই যেন ধরা আছে বাংলার মাটি, শৈশবের স্মৃতি, ফেলে আসা গ্রাম আর জন্মভূমির প্রতি এক অদম্য টান।
আবার তাঁরই কলমে—
“জয় বাংলা বাংলার জয়”,
“আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল”,
“একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়”—
এসব গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছে। বিবিসি বাংলার জরিপে নির্বাচিত সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকাতেও তাঁর লেখা একাধিক গান স্থান পেয়েছে।
১৯৬৪ সালে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার গীতিকারজীবনের সূচনা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি গান ও নাটক রচনা করেছেন। ১৯৬৭ সালে আয়না ও অবশিষ্ট চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গানের জগতে তাঁর প্রবেশ।
এরপর চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। গান লেখার পাশাপাশি তিনি কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, প্রযোজনা ও পরিচালনায়ও নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নান্টু ঘটক’, মুক্তি পায় ১৯৮২ সালে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি লিখেছেন ২০ হাজারেরও বেশি গান—একটি মানুষের জীবনের পক্ষে যা অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল সৃষ্টিসম্ভার। তাঁর লেখা গান গেয়েছেন বাংলাদেশের প্রায় সব প্রজন্মের খ্যাতিমান শিল্পী। প্রেম থেকে বিরহ, প্রকৃতি থেকে মানবতা, আধুনিকতা থেকে দেশপ্রেম—গানের বিচিত্র ভুবনে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ।
তাঁর গানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ অথচ গভীর ভাষা। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে তিনি এমন মায়াময় করে তুলতেন যে, গানগুলো সহজেই মানুষের আপন হয়ে যেত।
সাহিত্যের মতোই তাঁর গানেও ছিল গল্প। আর সেই গল্পের নায়ক-নায়িকা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকা, কখনো কৃষক-শ্রমিক, কখনো মুক্তিযোদ্ধা, আবার কখনো প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
বাংলা গানের পাশাপাশি চলচ্চিত্রাঙ্গনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও তিনি নির্মাণ করেছেন একাধিক চলচ্চিত্র। তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে একুশে পদক (২০০২) এবং স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১)।
ব্যক্তিজীবনেও তাঁর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন কন্যা দিঠি আনোয়ার। বাবার লেখা গান ভালোবেসে দিঠি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং টেলিভিশন আয়োজনে তাঁর গান পরিবেশন করে চলেছেন। ফলে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সৃষ্টির সঙ্গে নতুন প্রজন্মেরও একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি গীতিকবি।
আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে মনে পড়ে তাঁরই লেখা সেই আকুল উচ্চারণ—
“একবার যেতে দে না আমার
ছোট্ট সোনার গাঁয়…”
যে মানুষটি তাঁর কলম দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন দেশকে ভালোবাসতে, শেকড়কে চিনতে, মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে—তিনি শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর গান আছে।
থাকবে।
যতদিন বাংলাদেশের আকাশে সূর্য উঠবে, যতদিন নদী বয়ে যাবে, যতদিন মানুষ তার জন্মভূমিকে ভালোবাসবে—ততদিন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানও বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
গানের ভুবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তাঁর প্রয়াণে বাংলা গানের আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়।
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি
গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।


