কিছু গান কানে শোনা যায়, কিের প্রেমের কথা বলে, কিছু গান বলে না-পাওয়ার কথা। আবার কিছু গান এমনভাবে মনের দরজায় কড়া নাড়ে, যেন বহুদিনের চেনা কোনো মানুষ ফিরে এসে বলে—“আমি তো তোমারই কথা লিখেছিলাম!”
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান তেমনই। তাঁর গানের কথায় প্রেম আছে, বিরহ আছে, অভিমান আছে, জীবনের ছোট ছোট আনন্দ আছে। আছে এমন এক মায়া, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও শ্রোতার হৃদয়ে অমলিন থাকে।
“কে প্রথম কাছে এসেছি”—এই গানটি শুনলে আজও মনে হয়, ভালোবাসার প্রথম মুহূর্তটি যেন কোনো এক পুরোনো বিকেলে ফিরে এসেছে। লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দের কণ্ঠে গাওয়া এই অমর গানটি ১৯৬৬ সালের ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি। একই চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে “আজ মন চেয়েছে” গানটিও শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে।
কিন্তু পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একটি-দুটি জনপ্রিয় গানের গীতিকার নন। তিনি বাংলা গানের এক বিশাল ভুবন নির্মাণ করেছেন—যেখানে প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে জীবন, প্রকৃতি, হাসি, কান্না, অভিমান, দেশ, সমাজ এবং মানুষের অন্তর্গত অনুভূতির অসংখ্য রং।
জন্ম ও শৈশব
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২ মে ১৯৩১ সালে হাওড়ার সালকিয়ায়। তাঁর শৈশব কেটেছে হাওড়াতেই। শিল্প-সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির পরিবার নাটক, সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
শিল্পের প্রতি এই পারিবারিক টানই হয়তো তাঁকে এমন এক গীতিকার করে তুলেছিল, যিনি মানুষের মনের কথা এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে, এত মধুর ভাষায় লিখতে পারতেন।
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নাম
বাংলা চলচ্চিত্রের ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশক ছিল সংগীতের এক অসাধারণ সময়। সেই সময়ের সুরকার, গীতিকার ও শিল্পীদের সম্মিলিত সৃষ্টিতে বাংলা গান পেয়েছিল এক নতুন মাত্রা। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর গানের স্বতঃস্ফূর্ততা, সহজ ভাষা ও আবেগময় প্রকাশ তাঁকে সংগীতপরিচালকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, হৈমন্তী শুক্লা, শ্যামল মিত্র, ভূপেন হাজারিকা, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, অরুন্ধতী হোমচৌধুরী, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল, আরতী মুখোপাধ্যায়সহ বহু খ্যাতিমান শিল্পী তাঁর লেখা গান গেয়েছেন। তাঁদের কণ্ঠে পুলকের কথা পেয়েছে অমরত্বের স্পর্শ।
তাঁর গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়; তবে চার হাজারেরও বেশি গান রচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিপুল সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের গান, আধুনিক বাংলা গান, শ্যামাসংগীত, ছড়া, গল্প, উপন্যাস ও চিত্রনাট্য।
কিছু গান, কিছু স্মৃতি
১৯৬৬ সালের ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা গান বাংলা সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়।
“কে প্রথম কাছে এসেছি”—লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দের কণ্ঠে এক চিরন্তন প্রেমের গান।
“আজ মন চেয়েছে”—লতার কণ্ঠে এক অনির্বচনীয় অনুভূতির প্রকাশ।
১৯৬৯ সালের ‘প্রথম কদম ফুল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি লেখেন জনপ্রিয় গান—
“আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না”।
এ ছাড়া তাঁর লেখা অসংখ্য গান বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন—
“আমার বলার কিছু ছিল না”
“চিরদিনই তুমি যে আমার”
“ক ফোঁটা চোখের জল”
“তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন”
“নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা”
“ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে”
“এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার”
“রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে”
“সে আমার ছোট বোন”
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব”
এই গানগুলোর অনেকগুলোই আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
গানের পাশাপাশি সাহিত্যেও
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সৃজনশীল সাহিত্যিকও। গান লেখার পাশাপাশি তিনি উপন্যাস, চিত্রনাট্য, ছড়া ও গল্প লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমার প্রিয় গান’, ‘বাহাত্তুরে’, ‘শেষ সংলাপ’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কথায় কথায় রাত হয়ে যায়’।
১৯৯৬ সালে তাঁর লেখা আটটি আত্মজীবনীমূলক গান নিয়ে ‘আমি দেখেছি’ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, যেখানে মান্না দে তাঁর গান গেয়েছেন। তাঁর লেখা ‘মা আমার মা’ গানগুলিও বিশেষভাবে স্মরণীয়।
শেষ জীবনের বেদনা
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ছিল সৃষ্টির আনন্দে পরিপূর্ণ, কিন্তু শেষ অধ্যায়টি ছিল গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন। জীবনের শেষ দিকে তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর অন্তর্গত কষ্টের প্রকৃত কারণ আজও স্পষ্ট নয়।
১৯৯৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, হুগলি নদীতে লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর এই আকস্মিক চলে যাওয়া বাংলা সংগীতজগতে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল।
কী এমন অভিমান জমেছিল তাঁর বুকের গভীরে?
কী এমন না-পাওয়া, কী এমন নিঃসঙ্গতা তাঁকে জীবনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল?
আমরা জানি না।
জানি শুধু, যিনি মানুষের ভালোবাসার ভাষা লিখেছেন, যিনি অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে প্রেমের আলো জ্বেলেছেন, তাঁর নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল অন্ধকারে ঢাকা।
আজও তিনি আমাদের কাছে
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর গান আজও বেঁচে আছে। রেডিওতে, পুরোনো গ্রামোফোনে, টেলিভিশনের পর্দায়, কিংবা কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায় কারও মোবাইল ফোনে হঠাৎ বেজে ওঠে তাঁর গান—
“কে প্রথম কাছে এসেছি…”
তখন মনে হয়, সময় থেমে গেছে।
ফিরে এসেছে কোনো এক পুরোনো প্রেম।
ফিরে এসেছে কোনো এক হারানো বিকেল।
ফিরে এসেছে সেই মানুষটি, যাকে আমরা ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারিনি।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান আমাদের শিখিয়েছে—
ভালোবাসা শুধু কাছে পাওয়ার নাম নয়,
ভালোবাসা কখনো কখনো দূরে থেকেও হৃদয়ে বেঁচে থাকার নাম।
তাঁর গানের কথা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু মানুষের সৃষ্টি থেকে যায়।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাই থেকে গেছেন—
বাংলা গানের প্রতিটি মধুর সুরে,
প্রতিটি প্রেমের গানে,
প্রতিটি স্মৃতিময় সন্ধ্যায়।
খ্যাতিমান গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
জন্ম: ২ মে ১৯৩১ — মৃত্যু: ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।



