স্মরণে— বিপ্লবী বাঘা যতীন

স্বাধীনতার স্বপ্নে আত্মোৎসর্গী এক অগ্নিসন্তান

ভারতবর্ষের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাঘা যতীন একটি সাহসী ও অনন্য নাম। তাঁর প্রকৃত নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং যুগান্তর দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

জন্ম: ৭ ডিসেম্বর ১৮৭৯
জন্মস্থান: কয়া গ্রাম, কুমারখালী, কুষ্টিয়া
পিতা: উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
মাতা: শরৎশশী দেবী

শৈশব থেকেই যতীন্দ্রনাথ ছিলেন সাহসী, দৃঢ়চেতা ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত সক্ষম। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।

১৯০৬ সালে একটি বাঘের সঙ্গে তাঁর দুঃসাহসিক লড়াই তাঁকে এনে দেয় ‘বাঘা যতীন’ নামটি। কথিত আছে, একটি ছোরা হাতে তিনি বাঘের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হত্যা করেন। এই অসাধারণ সাহসিকতার ঘটনাই তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায় ‘বাঘা’ উপাধি।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল বাঘের বিরুদ্ধে নয়—ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে।

যতীন বুঝেছিলেন, বিচ্ছিন্নভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন। তাই তিনি বিপ্লবীদের সংগঠিত করেন এবং দেশব্যাপী একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা এগিয়ে নেন। তাঁর নেতৃত্বে যুগান্তর দলের কর্মকাণ্ড আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বিপ্লবী পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। জার্মানির সহযোগিতায় বিদেশ থেকে অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহ করে ভারতে ব্যাপক সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইতিহাসে এটি ‘জার্মান প্লট’ নামে পরিচিত।

পরিকল্পনা অনুযায়ী জার্মানি থেকে অস্ত্রবাহী জাহাজ উড়িষ্যার বালেশ্বর উপকূলে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে যায়। ফলে বিপ্লবীদের ওপর শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড় ও অভিযান।

শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বালেশ্বরের চাশাখণ্ডের কাছে বুড়িবালাম নদীর তীরে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে বাঘা যতীন ও তাঁর চার সহযোদ্ধার সম্মুখযুদ্ধ হয়।

সংখ্যায় ও অস্ত্রে তাঁরা ছিলেন অনেক পিছিয়ে। তবু আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তাঁরা সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নেন। সংঘর্ষে বাঘা যতীন গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁকে বালেশ্বর হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরদিন, ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

একজন বিপ্লবীর জীবনের মূল্য কেবল তাঁর বয়স দিয়ে মাপা যায় না। যতীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল—তিনি যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার জন্য নিজের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ ও জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা তখনও বহু দূরের স্বপ্ন। কিন্তু বাঘা যতীনের মতো বিপ্লবীদের সাহস ও আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মকে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁদের জীবন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও গভীর ও দৃঢ় করে তুলেছিল।

ইতিহাসের বিচারে তাঁর সশস্ত্র বিপ্লবের পথ নিয়ে নানা মূল্যায়ন থাকতে পারে; কিন্তু দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর সাহস, সংগঠকসুলভ দূরদর্শিতা এবং আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট।

আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

বিপ্লবী বাঘা যতীন—
অগ্নিযুগের এক সাহসী সন্তান,
যাঁর জীবন আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল ও বেদনাময় অধ্যায়।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।