“গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম—
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।”
“গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে—
গাড়ি চলে না।”
ভাটির মাটি, কালনীর ঢেউ, কৃষকের ঘাম আর সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনা থেকে উঠে এসে যিনি বাংলা লোকসংগীতকে দিয়েছেন এক অনন্য জীবনদর্শন—তিনি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, তাঁর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে ৯৩ বছর বয়সে সিলেটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি সাধক।
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। পিতা ইব্রাহিম আলী, মাতা নাইওরজান বিবি। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি পাননি; মাত্র বারো বছর বয়সে গ্রামের একটি নৈশবিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণাকে কখনো থামিয়ে রাখতে পারেনি। জীবন ও প্রকৃতিই হয়ে উঠেছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়।
শৈশব থেকেই ভাটির মানুষের জীবন, নদী, নৌকা, হাওর, কৃষিকাজ, উৎসব আর লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাউলসাধনা ও সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব এক সুরভুবন নির্মাণ করেন। তাঁর গান হয়ে ওঠে মানুষের গান, মাটির গান, প্রেমের গান, প্রতিবাদের গান এবং মুক্তির গান।
তিনি শুধু প্রেম ও বিরহের গান গাইতেন না—
গাইতেন শোষিত মানুষের কথা,
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা,
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবতার কথা,
আর হিন্দু-মুসলমানের মিলিত জীবন ও সম্প্রীতির কথা।
তাঁর কণ্ঠে তাই উচ্চারিত হয়েছে—
“গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম—
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।”
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিই যেন তাঁর জীবনদর্শনের এক অসাধারণ দলিল—
মানুষের পরিচয় সবার আগে মানুষ।
শাহ আব্দুল করিমের গান ভাটির জনপদে দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর সৃষ্টির সংখ্যা পাঁচ শতাধিক বলে বিভিন্ন জীবনীসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’,
‘গাড়ি চলে না’,
‘বন্দে মায়া লাগাইছে’,
‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’,
‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে’—
এমন অসংখ্য গান বাংলা লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর গান কখনো মরমি,
কখনো প্রেমময়,
কখনো দার্শনিক,
কখনো দ্রোহের আগুনে দীপ্ত।
আর এই কারণেই শাহ আব্দুল করিম কেবল একজন গায়ক নন—
তিনি ছিলেন একজন গণশিল্পী, দার্শনিক ও জীবনবোধের কবি।
তাঁর গানে আমরা খুঁজে পাই ভাটির মানুষের জীবনসংগ্রাম। খুঁজে পাই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। একই সঙ্গে আছে মানবপ্রেম, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
সঙ্গীত তাঁর কাছে নিছক বিনোদন ছিল না—
সঙ্গীত ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানোর ভাষা,
চেতনা জাগানোর হাতিয়ার,
আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।
বাংলার লোকসংগীতকে তিনি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে ভাটির একটি ছোট্ট গ্রামের মানুষের জীবনকথাও হয়ে উঠেছিল সমগ্র বিশ্বের মানুষের অনুভবের অংশ।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। তাঁর গান বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ইংরেজিতেও অনূদিত হয়েছে।
কিন্তু পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মানের চেয়েও বড় হয়ে আছে তাঁর মানুষের হৃদয়ে পাওয়া স্থান।
কারণ তিনি গেয়েছেন মানুষের জন্য—
মাটির মানুষের জন্য,
ভালোবাসার মানুষের জন্য,
নিপীড়িত মানুষের জন্য।
আজ যখন চারদিকে বিভাজনের দেয়াল উঁচু হয়,
মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ে,
সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বাতাস ভারী করে,
তখন শাহ আব্দুল করিমের সেই মানবতাবাদী গানগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
আজও যেন তাঁর কণ্ঠ থেকে ভেসে আসে—
মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই।
আজ কালনীর ঢেউ আছে,
আছে ভাটির বাতাস,
আছে হাওরের জল,
আছে বাউলদের একতারা—
শুধু নেই সেই মাটির মানুষটি।
তবুও তিনি হারিয়ে যাননি।
তিনি আছেন তাঁর গানে,
আছেন ভাটির মানুষের স্মৃতিতে,
আছেন বাংলার লোকসংস্কৃতির গভীরে,
আছেন অসাম্প্রদায়িক মানবতার প্রত্যয়ে।
১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯-এ তাঁর নশ্বর দেহ থেমে গেলেও তাঁর সৃষ্টির সুর থেমে যায়নি। জন্মভূমি দিরাইয়ের উজানধল গ্রামে স্ত্রী সরলা বিবির কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
বাউল সম্রাট চলে গেছেন—
কিন্তু তাঁর একতারা আজও বাজে।
হাওরের ঢেউয়ে,
নৌকার মাঝির কণ্ঠে,
গ্রামের মেঠোপথে,
কৃষকের ঘামে,
প্রেমিকের অপেক্ষায়,
আর মানুষের মুক্তির স্বপ্নে—
শাহ আব্দুল করিম আজও বেঁচে আছেন।
হে ভাটির সাধক,
হে মাটির মানুষের শিল্পী,
হে মানবতার বাউল—
তোমার গান যতদিন থাকবে,
ততদিন বাংলার মানুষ
তোমাকে ভুলবে না।
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের
১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে
তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই
গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিনম্র প্রণাম।
“আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম”—
সেই সুন্দর দিনের স্বপ্নই হোক
মানুষে মানুষে ভালোবাসার আগামী দিনের অঙ্গীকার।”


