কারও পৌষ, কারও সর্বনাশ—ক্রিকেটে একই মুহূর্ত কখনো দুই দলের জন্য দুই রকম গল্প লিখে দেয়। এজবাস্টন টেস্টের তৃতীয় দিন পাকিস্তানের জন্য যেমন ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর দিন, তেমনি ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (সিপিএল) দল জ্যামাইকা কিংসম্যানের জন্য হয়ে উঠেছিল বড় ধাক্কার কারণ।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টে পাকিস্তানের ইনিংস হার এড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার রাজাউল্লাহ। নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে নেমে তাঁর ৬৩ বলে ৮১ রানের ঝোড়ো ইনিংস ম্যাচের গতিপথই বদলে দেয়। আর তাঁর সেই ইনিংসের কারণেই নির্ধারিত ফ্লাইটে উঠতে পারেননি পাকিস্তানের ওপেনার সাইম আইয়ুব, যিনি একই সময়ে সিপিএলে জ্যামাইকার হয়ে খেলার কথা ছিল।
সাইমকে দ্রুত ক্যারিবিয়ানে পাঠানোর প্রস্তুতি আগেই নিয়েছিল জ্যামাইকা। ক্রিকইনফোর তথ্য অনুযায়ী, এজবাস্টন টেস্টের তৃতীয় দিনেই ম্যাচ শেষ হয়ে যেতে পারে ধরে নিয়ে শুক্রবারের ফ্লাইটে সাইমের টিকিট কেটে রেখেছিল দলটি।
পরিস্থিতিও তখন জ্যামাইকার ধারণার পক্ষেই ছিল। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের চেয়ে ৩২০ রানে পিছিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে মাত্র ৫২ রান তুলতেই হারিয়েছিল দুই উইকেট। ফলে তৃতীয় দিনেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল।
এই হিসাব থেকেই সাইমকে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কাছে অনুরোধ করেছিল জ্যামাইকা। পিসিবিও তাতে সম্মতি দিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, টেস্ট শেষ হওয়ার পর সাইম সরাসরি বিমানে উঠে ক্যারিবিয়ানে চলে যাবেন।
কিন্তু পাকিস্তানের শেষ দিকের ব্যাটিং সেই পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এনে দেয়।
তৃতীয় দিনে পাকিস্তানের নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে নামেন রাজাউল্লাহ। তখনও দিনের খেলা শেষ হতে এক ঘণ্টার বেশি সময় বাকি। পাকিস্তানের অবস্থা ছিল নাজুক, কিন্তু সেখান থেকেই অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি।
প্রথমে মোহাম্মদ আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে নবম উইকেটে ১২১ রানের জুটি গড়েন রাজাউল্লাহ। মাত্র ১২৩ বল স্থায়ী এই জুটিতে পাকিস্তান ম্যাচে ফেরার পথ খুঁজে পায়। আব্বাস ৪২ রান করে ফিরে গেলেও থামেননি রাজাউল্লাহ।
ফিফটি পেরিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন। দশম উইকেটে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গেও যোগ করেন আরও ১০ রান। শেষ পর্যন্ত দিনের শেষ ওভারে ৬৩ বলে ৮১ রান করে আউট হন রাজাউল্লাহ।
ততক্ষণে পাকিস্তানের লিড দাঁড়িয়েছে ১২৯ রানে। অর্থাৎ যে ম্যাচটি তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যাবে বলে ধরে নিয়েছিল জ্যামাইকা, সেটিই গড়িয়ে যায় চতুর্থ দিনে।
ফলে শুক্রবারের ফ্লাইটে ওঠার আর সুযোগ হয়নি সাইমের। অথচ তাঁকে দ্রুত বার্বাডোজে পৌঁছানো জ্যামাইকার জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শনিবার রাতে ব্রিজটাউনে বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল তাদের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। সিপিএলে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা সাইমকে সেই ম্যাচে পাওয়ার আশা করেছিল দলটি।
টুর্নামেন্টে তখন পর্যন্ত তিন ইনিংসে একটি সেঞ্চুরিসহ ১২৭ রান করেছিলেন সাইম। তাই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর অনুপস্থিতি জ্যামাইকার ব্যাটিং পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত সাইমকে ছাড়াই মাঠে নামতে হয় জ্যামাইকাকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসের কাছে তারা হেরে যায় দুই উইকেটে। এই পরাজয়ের ফলে প্লে-অফের দৌড় থেকেও ছিটকে যায় জ্যামাইকা।
একদিকে রাজাউল্লাহর ৮১ রানের ইনিংস পাকিস্তানকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে, অন্যদিকে সেই ইনিংসই সাইমের ক্যারিবিয়ানে ফেরার সময়সূচি বদলে দেয়। আর সাইমকে না পাওয়ার প্রভাব পড়ে জ্যামাইকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে।
ক্রিকেটের সূচি কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, ঘটনাটি তারই একটি মজার উদাহরণ। একটি টেস্ট ম্যাচের শেষ বিকেলে একজন লোয়ার-অর্ডার ব্যাটসম্যানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ বদলে দিল আরেকটি দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের পরিকল্পনা। শেষ পর্যন্ত রাজাউল্লাহ পেলেন নায়কোচিত স্বীকৃতি, আর জ্যামাইকার কাছে তাঁর ইনিংস হয়ে রইল দুর্ভাগ্যের আরেক নাম।


