ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ বালুচর এলাকায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় একটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের মালিকানাধীন জমি ও পুকুর দখলেরও চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দিয়েও মামলা করতে না পারায় নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে বলে দাবি করেছে পরিবারটি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে নিজেদের নিরাপত্তা ও বিচার দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বিবরণ দেন।
ভুক্তভোগী আউয়াল হোসেনের অভিযোগ, চাহিদামতো ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বাইরে থেকে লোকজন এনে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। গত ১১ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে বাইরে থেকে কেউ সেখানে যেতে না পারেন। ওই সময় বাড়িতে তিনজন নারী ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
আউয়াল হোসেন বলেন, হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে এবং ওয়াই-ফাইয়ের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর শুরু হয় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট। ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যাওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারটির দাবি, জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তবে পুলিশ চলে যাওয়ার পর হামলাকারীরা আবারও বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করেন আউয়াল হোসেন।
পরিবারের আরেক সদস্য মোমিন তালুকদার বলেন, গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে একটি সন্ত্রাসী দল এসে বাড়িতে হামলা চালায়। হামলার সময় পুরো টিনশেড ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে ঘরে থাকা আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সম্পত্তির মালিকানা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, হযরতপুর মৌজায় সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ানভুক্ত প্রায় ২১১ শতাংশ জমির মূল মালিক ছিলেন তাদের বাবা। তিনি ক্রয়সূত্রে ওই সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেন। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। জমির নামজারি করা হয়েছে এবং নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করা হচ্ছে বলে দাবি পরিবারের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা লাঠিসোটা, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই জমিতে প্রবেশ করে পুকুর দখলের চেষ্টা করেন। এ সময় পুকুরপাড়ের কলাগাছ ও আমগাছ কেটে ফেলা হয়। নষ্ট করা হয় বিভিন্ন ধরনের সবজি। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পাশাপাশি পুকুরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে নিয়ে গিয়ে আরও প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গেলে অভিযুক্তরা তাদের ভয়ভীতি দেখান এবং হুমকি দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এর আগে একই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে অভিযোগকারী ও তার ভাই-বোনেরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানানো হয়। এ বিষয়ে পিটিশন মামলা নং-১৯৪/২৬ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় মামলা করার কথা উল্লেখ করেন তারা।
ভুক্তভোগী আছিয়া বলেন, তিনি হযরতপুরের বাসিন্দা এবং দক্ষিণ বালুচরের বাপের বাড়ির সম্পত্তিকে ঘিরেই তাদের এই বিরোধ। তার ভাষ্য, পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ করে চাঁদার দাবি এবং হামলার ঘটনায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
আছিয়ার অভিযোগ, এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা নিচ্ছে না। তিনি বলেন, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তার ভাইয়েরা প্রবাসে থাকেন এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “ওরা ২০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছে। আমার ভাইরা থাকে প্রবাসে। কোথা থেকে তারা এত টাকা দেবে? আমরা বিচার ও নিরাপত্তা চাই।”
নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন আছিয়া। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
এদিকে চাঁদাবাজি, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল কুদ্দুস বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। কোনো ঘটনা তার মনে পড়ছে না। তিনি খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলে জানান।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের সত্যতা, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সম্পত্তির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত ও আদালতের নথিপত্রের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তবে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগের পর পরিবারটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।


