সৌদি আরবগামী প্রবাসীদের অজান্তেই তাঁদের লাগেজে ওষুধের প্যাকেটের আড়ালে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে পরপর দুটি চালান আটকের ঘটনায় এমন একটি চক্রের কর্মকাণ্ড সামনে এসেছে। দুই ঘটনায় মোট ৫২০টি ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ ও স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, পুলিশের বক্তব্য, মামলার এজাহার এবং কয়েকটি অডিও কথোপকথন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, চক্রটির সঙ্গে শাহরাস্তির বাসিন্দা আরিফ হোসেন, মাহমুদুল হাসান ও মহিন উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে আরিফ বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। মাহমুদুল ও মহিন সৌদি আরবে রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা সৌদি আরবগামী যাত্রীদের আগে থেকেই শনাক্ত করতেন। পরিচিতজন বা একই এলাকার মানুষ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হতো, সৌদি আরবে ওষুধের দাম বেশি। তাই অল্প কিছু ওষুধ সঙ্গে করে নিয়ে গেলে উপকার হবে। যাত্রীরা সম্মত হওয়ার পর দেশে থাকা সহযোগীরা ওষুধের প্যাকেটের ভেতর থেকে আসল ওষুধ সরিয়ে সেখানে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিতেন। পরে প্যাকেট এমনভাবে বন্ধ করা হতো, যাতে বাইরে থেকে সেটিকে সাধারণ ওষুধের প্যাকেট বলেই মনে হয়।
চক্রটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সৌদিতে চালান পৌঁছানোর বিনিময়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলতেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে যাঁদের মাধ্যমে চালান পাঠানো হতো, তাঁদের অনেকেই প্যাকেটের ভেতরে কী রয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওষুধের প্যাকেটে ১৬০ ইয়াবা
গত ২৭ আগস্ট সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল শাহরাস্তির টামটা ছৈয়াল বাড়ির সুজন মিয়ার। এর পাঁচ দিন আগে একই এলাকার মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সুজন সৌদি যাচ্ছেন কি না জানতে চান মাহমুদুল। সম্মতি পাওয়ার পর তিনি প্রায় আধা কেজি ওষুধের একটি প্যাকেট সঙ্গে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ফিনিক্স-২০ ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের প্যাকেটে বিশেষ কৌশলে ১৬০টি ইয়াবা লুকানো হয়েছিল। প্যাকেটটি সুজনের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক ওরফে অনিক এবং আরিফ।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শাহরাস্তি থানার পুলিশ মুন্সি গাজী পাটোয়ারী বাড়ির পশ্চিম পাশের সড়কে অভিযান চালায়। সেখানে ইয়াবাসহ অনিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় আরিফ দৌড়ে পালিয়ে যান।
এ ঘটনায় গত ২৫ আগস্ট শাহরাস্তি থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় অনিককে আসামি করার পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনিক জানিয়েছেন, ইয়াবাগুলো বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই ওষুধের প্যাকেটের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সেগুলো সুজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
শাহরাস্তি থানার ওসি মীর মাহবুবুর রহমান জানান, ১৬০টি ইয়াবাসহ অনিককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আরিফ ও মাহমুদুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে অনিককে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আগের চালানেও ৩৬০ ইয়াবা
এর আগে একই ধরনের কৌশলে আরেক সৌদিপ্রবাসীর কাছে ৩৬০টি ইয়াবা পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। গত ১ আগস্ট শাহরাস্তির ভোলদিঘী বাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সন্দেহের কারণে চালানটি আটকে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সৌদিপ্রবাসী আরিফ হোসেনের স্ত্রী রুনা আক্তার একটি প্যাকেট হাক্কানী ট্রেডার্সের পরিচালক এনায়েত হোসেনের কাছে দেন। সেটি মালড়া গ্রামের সৌদিগামী রাশেদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।
প্যাকেটটির ওজন ও আকার দেখে এনায়েতের সন্দেহ হয়। একা প্যাকেট না খুলে তিনি আশপাশের ব্যবসায়ীদের ডাকেন। পরে ভিডিও ধারণ করে সবার সামনে প্যাকেটটি খোলা হয়। ভেতরে ফিনিক্স-২০ ও র্যাবিপ্রাজল সোডিয়ামের ১২টি প্যাকেট পাওয়া যায়। কিন্তু ওষুধ সরিয়ে প্রতিটি প্যাকেটের মধ্যে ৩০টি করে ইয়াবা রাখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ইয়াবার সংখ্যা ছিল ৩৬০টি।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ইয়াবাগুলো জব্দ করে। পরে বেলাল হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, ঘটনার পর রুনা আত্মগোপনে চলে যান।
এনায়েত হোসেন বলেন, প্যাকেটটি দেখে তাঁর সন্দেহ হয়েছিল। সে কারণে আশপাশের লোকজনকে ডেকে এনে ভিডিও চালু করে প্যাকেটটি খোলা হয়। বাইরে থেকে দেখে ভেতরে ইয়াবা রয়েছে, তা বোঝার সুযোগ ছিল না বলেও জানান তিনি।
যাঁর কাছে প্যাকেটটি যাওয়ার কথা ছিল, সেই সৌদিপ্রবাসী রাশেদ জানান, আরিফ তাঁকে ফোন করে কয়েকটি ওষুধ সঙ্গে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। পরে আরিফের স্ত্রী তাঁর বাড়িতে প্যাকেটটি নিয়ে যান। রাশেদ সেটি বাড়িতে না রেখে বাজারের কোনো দোকানে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
রাশেদের ভাষ্য, প্যাকেটটি ধরা না পড়লে তিনি জানতেই পারতেন না যে তাঁকে ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমানবন্দরে তাঁর কাছে ইয়াবা পাওয়া গেলে এর দায় তাঁকেই বহন করতে হতো—এমন আশঙ্কার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
সৌদিতে চালান গ্রহণের অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চক্রটি শুধু দেশে বসে ইয়াবা প্যাকেট তৈরির কাজ করত না। সৌদি আরবেও তাদের সদস্যরা চালান গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হতো বলে জানা গেছে। সৌদিতে যাতায়াত করেন এমন ব্যক্তি, বিশেষ করে পরিচিত বা একই এলাকার মানুষদের বেছে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। এরপর ওষুধের কথা বলে প্যাকেট বহনের অনুরোধ করা হতো।
দেশে থাকা সহযোগীরা ওষুধের পাতা বা মোড়ক থেকে আসল ওষুধ সরিয়ে সেখানে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিতেন বলে অভিযোগ। এরপর প্যাকেট এমনভাবে প্রস্তুত করা হতো, যাতে সেটি সাধারণ ওষুধের চালান বলে মনে হয়।
প্রবাসীদের কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর আরিফ, মাহমুদুল ও মহিনের মধ্যে কেউ একজন ওই চালান গ্রহণ করতেন। আরিফ এর আগে সৌদি আরবে অবস্থান করেছেন এবং তখনও প্রবাসীদের কাছ থেকে মাদকের চালান গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সৌদিতে থাকা মাহমুদুল ও মহিনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রবাসী।
তবে অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল তা অস্বীকার করেছেন। একটি অডিও কথোপকথনে তাঁকে প্রায় ছয় বছর ‘মাল’ বা ইয়াবা বিক্রির কথা বলতে শোনা গেলেও সাম্প্রতিক চালানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। অনিককে চেনেন না বলেও দাবি করেন তিনি। সুজনকে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠানোর কথা স্বীকার করলেও সেটি ইয়াবা বহনের উদ্দেশ্যে ছিল না বলে তাঁর বক্তব্য।
অডিওতে উঠে এসেছে আরও অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সৌদিপ্রবাসী জানান, ২০২৪ সালে দেশে ফেরার পর মহিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সৌদি আরবে ফেরার সময় কিছু ওষুধ নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তাড়াহুড়োর কারণে তিনি সেগুলো নেননি। পরে জানতে পারেন, এলাকার সৌদিগামী প্রবাসীদের ওষুধের কথা বলে ইয়াবা বহনে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
আরেকটি অডিওতে মাহমুদুলের স্ত্রী নুসরাতকে বলতে শোনা যায়, তাঁর স্বামী সৌদিগামী কারও সন্ধান পেলে জানাতে বলেছিলেন। পরে মহিন একটি চালান পাঠানোর বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন বলে ওই কথোপকথনে উল্লেখ রয়েছে।
নুসরাতকে আরও বলতে শোনা যায়, তিনি তাঁর স্বামীকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনিকের মাধ্যমে সুজনের কাছে একটি চালান পাঠানো হয়। পথে অনিক গ্রেপ্তার হন।
ওই অডিওতে নুসরাত আরও দাবি করেন, যাঁদের মাধ্যমে এসব চালান পাঠানো হয়, তাঁদের অনেকেই প্যাকেটের ভেতরে ওষুধ নাকি ইয়াবা—কিছুই জানেন না। ঋণ ও ধারদেনা করে বিদেশে যাওয়া কোনো প্রবাসী এভাবে মাদকসহ ধরা পড়লে তাঁর নিজের পাশাপাশি পুরো পরিবারও মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আরেকটি অডিও কথোপকথনে মহিন উদ্দিনকে এক প্রবাসীকে হুমকি দিতে শোনা যায়। ওই কথোপকথনের বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে যাচাই করার বিষয়।
বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর কথা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রবাসী অভিযোগ করেছেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সৌদিগামী যাত্রীদের ব্যবহার করে আসছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেশ থেকে মাদক পাঠানোর পাশাপাশি ফেরার সময় স্বর্ণ আনার অভিযোগও রয়েছে। সৌদি আরবে মাদক কেনাবেচাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন প্রবাসী।
এদিকে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা রাকিব হাসান জানিয়েছেন, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মাদক চোরাচালান, মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ ঠেকাতে বিশেষ দল কাজ করছে। সম্প্রতি এক যাত্রীর কাছ থেকে ৪ হাজার ৩৬৪টি ইয়াবা উদ্ধারের কথাও তিনি জানান।
তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব সময় সতর্ক রয়েছে। বিদেশে মাদক পাচারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনাগুলোতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো নির্দোষ যাত্রীদের অজান্তে মাদক বহনে ব্যবহার করা। একজন প্রবাসী নিজের ব্যাগে কী বহন করছেন, তা না জেনে বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে বিদেশযাত্রার আগে অন্যের দেওয়া ওষুধ, প্যাকেট বা লাগেজ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
এ ঘটনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলাগুলোর তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।


