বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেনের আদালতে নজরুল ইসলামকে হাজির করা হয়। তাঁর উপস্থিতিতেই রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি তেজগাঁও জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিলেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ডিবির আবেদনে বলা হয়েছে, আগের চার দিনের রিমান্ডে নজরুল ইসলামকে মামলার ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে গেছেন। ফলে মামলার বিভিন্ন দিক যাচাই করতে তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
তদন্ত আবেদনে আরও বলা হয়, মরিয়মের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। পারিবারিক নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের জন্য আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে যুক্তি তুলে ধরেছে পুলিশ।
ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মরিয়মের কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পরে সিআইডির সহায়তায় দরজা খুলে পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে কয়েকটি চিরকুটও পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এটি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলের আলামত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পারিবারিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বাবার মামলায় তিনজন আসামি
মরিয়মের মৃত্যুর পরদিন তাঁর বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় জি এম নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ও নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলা হওয়ার পর রাতেই নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ওবায়দুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেদিন তদন্তের স্বার্থে দুজনেরই সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অভিযোগ অস্বীকার নজরুলের
আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন জি এম নজরুল ইসলাম। ২১ সেপ্টেম্বর রিমান্ড শুনানি শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেন। মরিয়ম নিজেই আত্মহত্যা করেছেন—এমন বক্তব্যও দেন তিনি।
অন্যদিকে, মামলার বাদী ও মরিয়মের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। নতুন করে চার দিনের রিমান্ডে নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আগের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য ও আলামত মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করবে তদন্তকারী দল। তবে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ বা সন্দেহকে এখনই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।


