নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ধলেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে এককভাবে মাটি কাটা অসম্ভব হয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একদল স্থানীয় নেতাকর্মী গোপনে হাত মেলান বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তাৎক্ষণিক অভিযানে শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে তাদের সেই গোপন বৈঠক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফতুল্লার ধলেশ্বরী নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন করে আসছিল। সম্প্রতি ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনসিপি) এক স্থানীয় নেতা এর প্রতিবাদ জানালে তাঁকেও মারধরের শিকার হতে হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে পুলিশ প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নেয় এবং নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার সব ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
পুলিশের এই কঠোর অবস্থানের পর চরম বিপাকে পড়েন মাটি কাটার সাথে যুক্ত প্রভাবশালীরা। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী এই ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেও প্রশাসনের বাধার কারণে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা ও ক্যাডারদের সাথে যৌথভাবে মাটি কাটা চালিয়ে যাওয়ার এক অভিনব কৌশল নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার দুপুরে ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের সিপাইপাড়া এলাকায় ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কাদির সিবিআইয়ের বাসভবনে এক গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, মাটি কাটার নতুন চুক্তি ও সিন্ডিকেট গঠনের উদ্দেশে আয়োজিত এই বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা ছিল বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল প্রধানের।
বৈঠক শুরু হতেই সেখানে উপস্থিত হন বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছামেদ আলী, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সম্পাদক হাসান আলী, ১ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সহসভাপতি মান্নেক খান এবং যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন মেসিসহ আরও অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী। ডিবির তথ্যমতে, বৈঠকে উপস্থিত অধিকাংশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া একাধিক মামলা রয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি চৌকস দল কাদির সিবিআইয়ের বাড়িতে অতর্কিত অভিযান চালায়। ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশল পাল্টায় কাদির ও তাঁর সহযোগীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পথরোধ করতে বাড়ির নারীদের সামনে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই সুযোগে ছামেদ আলীসহ অন্যান্য মামলার আসামিরা দ্রুত সটকে পড়েন। ডিবির অভিযানের মুখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যৌথ সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে যাওয়া ডিবি পুলিশের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, অভিযানে যাওয়া সদস্যরা ছামেদ আলী ও তাঁর সাথে থাকা অন্য আসামিদের তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি চিনে উঠতে না পারার সুযোগে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে তাদের গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল প্রধান। তিনি দাবি করেন, “আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে আমার বৈঠকের খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সত্য নয়। এমনকি কাদির সিবিআই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন কি না, তাও আমার জানা নেই।”
অবৈধভাবে নদী থেকে মাটি কাটা বন্ধ করতে এবং পালিয়ে যাওয়া আসামিদের আইনের আওতায় আনতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও ফতুল্লা থানা পুলিশের যৌথ নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।


