সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তবে এবারকার চ্যালেঞ্জটা আলাদা। ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টির পর এবার প্রথমবারের মতো দেশটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সীমিত ওভারের দিবারাত্রির ম্যাচের সঙ্গে পাঁচ দিনের টেস্টের প্রস্তুতি এক নয়। বিশেষ করে দিনের প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৯ অক্টোবরের একমাত্র টেস্টের আগে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। গত ১ অক্টোবর দুবাইয়ে পৌঁছায় দল। শুরুতে আইসিসি একাডেমি মাঠে অনুশীলন করে তারা। এরপর একই মাঠে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই দিনের একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। ম্যাচটি শেষ হয়েছে ড্রয়ে।
দুবাইয়ের গরম এরই মধ্যে বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছেন ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রকাশ করা এক ভিডিওতে পেসার ইবাদত হোসেন জানিয়েছেন, প্রায় ৪৫ ডিগ্রি অনুভূত তাপমাত্রার মধ্যে শরীরকে স্বাভাবিক রাখার জন্য তাঁকে বিশেষভাবে পানি ও তরল গ্রহণের দিকে নজর দিতে হচ্ছে।
ইবাদতের প্রস্তুতি শুরু হয় ম্যাচেরও আগে। তাঁর ভাষায়, ম্যাচের দুই দিন আগে থেকেই তিনি শরীরকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। পর্যাপ্ত পানি ও বিভিন্ন ধরনের পানীয় পান করার পাশাপাশি ডাবের পানি ও ফলমূল খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাঁচ দিনের ম্যাচে দীর্ঘ সময় বোলিং করার ক্ষেত্রে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হলে কর্মক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে—তাই শুরু থেকেই তরল গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এই পেসার।
শুধু পানি পান করাই নয়, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজের একটি অভ্যাসের কথাও জানিয়েছেন ইবাদত। দুবাইয়ে এসে প্রথম দিনের অনুশীলনে তিনি খালি পায়ে প্রায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা মাঠে হাঁটেন। তাঁর মতে, এতে মাঠের সঙ্গে শরীরের একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয় এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার অনুভূতি পাওয়া যায়।
এ ধরনের কন্ডিশনে খেলতে হলে আগেভাগে আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা নেওয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ইবাদত। আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং দিনের গরম কেমন হতে পারে—এসব বিষয় আগে থেকেই জানা থাকলে প্রস্তুতিও সে অনুযায়ী নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটারদের জন্যও সংযুক্ত আরব আমিরাত বা উপসাগরীয় অঞ্চলের গরম কন্ডিশন একেবারে অপরিচিত নয়। নিয়মিত বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল এসব অঞ্চলে খেলতে যায়। ১০ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিপক্ষে পাঁচটি এবং ওমানের বিপক্ষে দুটি ৫০ ওভারের ম্যাচের সিরিজ খেলতে ওমানে যাওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের। ফলে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্যও গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ক্রিকেটারদের নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৩৪ রানে অলআউট হয়। সৌম্য সরকার ৫৭ রান করে দলের সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলেন। সাদমান ইসলাম করেন ৪৬, নাঈম হাসান ৩৬ এবং মুমিনুল হক ৩৩ রান।
জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইনিংস থামে ২২২ রানে। ৫৩.৫ ওভারে তাদের অলআউট করে বাংলাদেশ। রিজার্ভ হিসেবে দলের সঙ্গে থাকা পেসার ইকবাল হোসেন ৪ উইকেট নেন। বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম পান ৩ উইকেট। ইবাদত হোসেন ৯ ওভার বল করে ৩৮ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬.৫ ওভারে ৩ উইকেটে ১১৪ রান আসে। মুশফিকুর রহিম ৪৪ এবং সাদমান ইসলাম ৩২ রান করেন। প্রস্তুতি ম্যাচের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফলের চেয়ে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং টেস্টের আগে ব্যাটার-বোলারদের দীর্ঘ সংস্করণের ছন্দে ফেরানো।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে এই কন্ডিশনই বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে। টেস্ট ক্রিকেটে একই দিনে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হয়, আবার ম্যাচের পাঁচ দিন ধরেই শরীরের ওপর চাপ সামলাতে হয়। গরমের মধ্যে পেসারদের বোলিং স্পেল, ব্যাটারদের দীর্ঘ ইনিংস এবং ফিল্ডারদের টানা মনোযোগ ধরে রাখা—সবকিছুর সঙ্গে তাপমাত্রার বিষয়টি সরাসরি জড়িয়ে আছে।
ইবাদত তাই ঘরে থাকার সময়ও শরীরে পানির ঘাটতি না হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, প্রচুর পানি পান করার পাশাপাশি নাশতার সময় ফল খাওয়া, ডাবের পানি ও তরমুজ খাওয়া এবং নিয়মিত তরল গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য আরব আমিরাতের টেস্টটি তাই শুধু প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই নয়; নতুন পরিবেশে দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ারও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য ব্যাট-বল অনুশীলনের পাশাপাশি শরীরকে গরমের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোও প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।


