টানা নয় জয়ে স্প্যানিশ ফুটবলে নতুন ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বার্সেলোনা। হান্সি ফ্লিকের অধীনে লা লিগায় দুর্দান্ত ছন্দে থাকা কাতালান ক্লাবটি রিয়াল বেতিসকে তাদের মাঠে ৫-২ গোলে হারিয়ে মৌসুমের প্রথম নয় ম্যাচেই জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এর মধ্য দিয়ে স্প্যানিশ লিগের ইতিহাসে মৌসুমের শুরুতে টানা নয় জয়ের পুরোনো রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে তারা। এখন এককভাবে এই রেকর্ড নিজেদের করে নেওয়ার অপেক্ষা। আর সেই সুযোগ সামনে এলে প্রতিপক্ষ হতে পারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ।
সেভিয়ার লা কার্তুহা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ছিল গোল, উত্তেজনা ও নাটকীয়তায় ভরপুর। বার্সেলোনার হয়ে গোল করেন লামিনে ইয়ামাল, রদ্রি, গ্যাব্রিয়েল জেসুস, এরিক গার্সিয়া ও দানি ওলমো। স্বাগতিক রিয়াল বেতিসের হয়ে জালের দেখা পান ভ্যালেন্তিন গোমেস ও আবদে এজালজুলি। দুই দলের আক্রমণাত্মক ফুটবলে ম্যাচটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পাশাপাশি বাতিল হওয়া গোল এবং লাল কার্ডের ঘটনাও লড়াইয়ে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করে।
দ্বিতীয়ার্ধে ফাকুন্দো বেরনাল লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় বেতিস। সংখ্যাগত এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে বার্সেলোনা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে। এই ফল শুধু তিন পয়েন্ট অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দলটির ধারাবাহিকতা, আক্রমণাত্মক সামর্থ্য এবং ফ্লিকের অধীনে গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিফলন।
লা লিগার মৌসুমের প্রথম নয় ম্যাচে টানা জয়ের রেকর্ডটি এত দিন এককভাবে ছিল রিয়াল মাদ্রিদের দখলে। ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল স্পেনের রাজধানীর ক্লাবটি। দীর্ঘ সময় পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসাল বার্সেলোনা। তবে দুই দলের কৃতিত্বের মধ্যে গোলসংখ্যার দিক থেকে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে প্রথম নয় ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ করেছিল ২১ গোল। বিপরীতে চলতি মৌসুমে একইসংখ্যক ম্যাচে বার্সেলোনার গোল ৩৯টি।
অর্থাৎ, প্রথম নয় ম্যাচে রিয়ালের ওই সময়ের গোলসংখ্যার তুলনায় ১৮টি বেশি গোল করেছে বার্সেলোনা। প্রতি ম্যাচে গড়ে ৪টিরও বেশি গোল করার এই পরিসংখ্যান তাদের আক্রমণভাগের কার্যকারিতা তুলে ধরে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে গোল হজম করেছে মাত্র নয়টি। গোল করা ও গোল ঠেকানোর এই সমন্বয়ই দলটিকে মৌসুমের শুরুতে এতটা সফল করে তুলেছে।
বার্সেলোনার এই অর্জনের পেছনে রয়েছে অতীতের একটি হতাশার স্মৃতিও। ২০১৩-১৪ মৌসুমে জেরার্দো মার্তিনোর অধীনে দলটি লা লিগার প্রথম আট ম্যাচে টানা জয় পেয়েছিল। কিন্তু নবম ম্যাচে ওসাসুনার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করায় সেই জয়যাত্রা থেমে যায়। ফলে মৌসুমের প্রথম নয় ম্যাচে টানা জয়ের রেকর্ড গড়ার সুযোগ সেবার হাতছাড়া হয়েছিল কাতালানদের। এবার ফ্লিকের দল সেই বাধা পেরিয়ে নতুন করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে।
লা লিগার বাইরেও বার্সেলোনার শুরুটা ছিল সমানভাবে আশাব্যঞ্জক। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমের প্রথম ১১ ম্যাচেই জয় পেয়েছে দলটি। এই ধারাবাহিকতা তাদের সমর্থকদের প্রত্যাশা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘ মৌসুমে এমন ছন্দ ধরে রাখতে হলে খেলোয়াড়দের ফিটনেস, দলের ভারসাম্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এখন বার্সেলোনার সামনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রেকর্ডটি এককভাবে নিজেদের করে নেওয়া। সেই লক্ষ্য পূরণ হলে ক্লাবটির ইতিহাসে যোগ হবে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সম্ভাব্য লড়াইয়ে এই রেকর্ড অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে ম্যাচটির গুরুত্বও বেড়ে যাবে বহুগুণ। কারণ, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি লড়াই শুধু পয়েন্টের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মর্যাদা, সমর্থকদের আবেগ এবং স্প্যানিশ ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
নয় ম্যাচে নয় জয়, ৩৯ গোল এবং মাত্র নয়টি গোল হজম—পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, মৌসুমের শুরুতে কতটা কার্যকর ফুটবল খেলছে বার্সেলোনা। তবে রেকর্ডের সমান হওয়া আর সেটিকে এককভাবে নিজের করে নেওয়া এক বিষয় নয়। সেই শেষ ধাপ পেরোতে পারলে ফ্লিকের দল তাদের দুর্দান্ত সূচনাকে আরও স্মরণীয় করে তুলবে।


