ভালোবাসার অপরাধ, নাকি ক্ষমতার দম্ভ? সৌদি আরবে এক নবদম্পতির মর্মান্তিক পরিণতি এবং আমাদের নীরবতার প্রশ্ন

একজন নাগরিক হিসেবে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাই। ন্যায়বিচার চাই, জবাবদিহি চাই, আর চাই প্রতিটি মানুষের জীবনের মর্যাদা।

আমার কর্মজীবনের সুবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার, নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে মেশার এবং তাদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা ও আচরণ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, সম্মেলন ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে যেমন অসংখ্য ভদ্র, মার্জিত ও মানবিক মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, তেমনি এমন কিছু অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হয়েছি, যা মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

বিশেষ করে নারীর প্রতি অসম্মান, যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রতিশোধ নিতে চাওয়ার মতো আচরণ আমাকে বারবার ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানি কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর এমন আচরণ আমি নিজের চোখে দেখেছি, যা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নারীর সম্মতি উপেক্ষা করে কুপ্রস্তাব দেওয়া, প্রত্যাখ্যাত হলে মদ্যপ অবস্থায় উত্যক্ত করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনারও সাক্ষী হয়েছি। কাঠমান্ডু ও ব্যাংককে এমন কয়েকটি ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাধা দেওয়া, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আগে ক্ষমা চাইতে দেখা এবং লিখিত মুচলেকা দেওয়ার ঘটনাও আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অংশ।

এসব অভিজ্ঞতা আমাকে একটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি করেছে—মানুষের পোশাক, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক মর্যাদা দিয়ে তার চরিত্রের বিচার করা যায় না। প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার আচরণে, বিশেষ করে সে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কাউকে কীভাবে বিবেচনা করে এবং অন্যের ‘না’ বলার অধিকারকে কতটা সম্মান করে।

বিদেশে বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথোপকথনেও মুসলিম পরিচয় নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কথা শুনেছি। আমার কাজের এসাইনমেন্টের জন্য ব্যাংকক, আমস্টারডাম ও প্যারিসে যৌনকর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনা পেয়েছি, যেখানে পাকিস্তানি, সৌদি আরবের কিছু নাগরিক এবং অন্যান্য আরব দেশের কিছু পুরুষের কথিত যৌন অসদাচরণ ও নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণের প্রসঙ্গ এসেছে। তাদের কারও কারও বক্তব্যে এসব অভিজ্ঞতার কারণে মুসলমানদের সম্পর্কেও বিরূপ ধারণা তৈরি হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের দায় একটি গোটা জাতি কিংবা ধর্মের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। বরং যারা এমন আচরণ করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং যারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করাই হওয়া উচিত আমাদের অবস্থান। ইসলাম হোক কিংবা অন্য কোনো ধর্ম—কোনো ধর্মীয় পরিচয়ই যৌন হয়রানি, নির্যাতন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের বৈধতা দিতে পারে না।

কিন্তু আজ আমার ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু আমার অতীতের সেই অভিজ্ঞতাগুলো নয়। আমার ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু সৌদি আরবে এক নবদম্পতিকে ঘিরে বর্ণিত সেই মর্মান্তিক ঘটনা, যা আমাদের সামনে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

একটি নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণ-তরুণী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাঁদের কাছে পৃথিবীটা থাকে সম্ভাবনায় ভরা। একসঙ্গে পথচলা, সংসার সাজানো, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা—এসব নিয়েই তাঁদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ধর্মীয় আবেগ ও পবিত্রতার টানে কেউ যখন হজ কিংবা উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান, তখন তাঁর প্রত্যাশা থাকে নিরাপত্তা, প্রশান্তি এবং সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভের।

কিন্তু সেই পবিত্র ভূমিতে গিয়ে যদি কোনো নবদম্পতিকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে তাঁদের জীবন, মর্যাদা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারই প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়—এটি আমাদের সামষ্টিক বিবেকের জন্যও এক গভীর আঘাত।

আমার কাছে প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, এই দম্পতিকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের দূতাবাসকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, যাচাইকৃত বিবরণ ও আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু সেই সতর্কতা কোনোভাবেই প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। বরং অভিযোগ যদি গুরুতর হয়, তবে তার সুষ্ঠু তদন্ত, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা আরও জরুরি।

কোনো মানুষকে অপরাধী বললেই সে অপরাধী হয়ে যায় না। অভিযোগের জবাব দেওয়ার অধিকার, ন্যায়সংগত বিচার এবং আইনি সুরক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আমি জানতে চাই, এই দম্পতির সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল? তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল? সেই অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ ছিল? তাঁরা কি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন? তাঁদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি? বাংলাদেশের দূতাবাস কি বিষয়টি জানত? জেনে থাকলে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, আর না জেনে থাকলে কেন জানেনি?

আমাদের রাষ্ট্র কি বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়া তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যথেষ্ট তৎপর? বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন যখন সংকটে পড়ে, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কি কেবল পরিবারের, নাকি রাষ্ট্রেরও?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা চাই। কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কের অস্বস্তি, কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কিংবা কোনো ধর্মীয় আবেগ যেন সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

সৌদি আরব মুসলমানদের কাছে পবিত্র ভূমি। সেই পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, কোনো দেশের ধর্মীয় মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক শক্তি সেই দেশের কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। পবিত্র ভূমিতে সংঘটিত কোনো অন্যায়ের অভিযোগ উঠলে তা আরও বেশি সততা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আমি চাই না, কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে একটি জাতির সব মানুষকে ঘৃণা করা হোক। আমি চাই না, কোনো দেশের সাধারণ মানুষকে তাদের জাতীয় পরিচয়ের কারণে অপমানিত হতে হোক। কিন্তু আমি এটাও মেনে নিতে পারি না যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হিসাব-নিকাশের আড়ালে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের ন্যায়বিচারের দাবি চাপা পড়ে থাকবে।

আমাদের প্রতিবাদ কোনো জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য নয়; আমাদের প্রতিবাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে, নারীর প্রতি অসম্মানের বিরুদ্ধে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করার বিরুদ্ধে।

আজ এই নবদম্পতিকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রশ্নগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশের দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রয়োজন।

আমি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই—ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করুন, পরিবারের পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিন এবং জনসমক্ষে যথাযথ ব্যাখ্যা তুলে ধরুন। ন্যায়বিচারের দাবি যেন কোনোভাবেই কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে।

সবশেষে, এই নবদম্পতির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করছি। তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে কী ঘটেছিল, তার সত্য যেন কখনো হারিয়ে না যায়। তাঁদের পরিবার যেন সত্য জানতে পারে, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি পায় এবং রাষ্ট্র যেন তাদের একা ফেলে না রাখে।

মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি তাঁদের প্রতি অসীম রহমত বর্ষণ করুন, তাঁদের পবিত্র ভালোবাসাকে কবুল করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অসহনীয় বেদনা বহন করার শক্তি ও ধৈর্য দান করুন।

আমাদের প্রতিবাদ প্রতিশোধের জন্য নয়—সত্যের জন্য। আমাদের দাবি বিদ্বেষের জন্য নয়—ন্যায়বিচারের জন্য। আর আমাদের শোক কেবল দুটি মানুষের জন্য নয়—এটি সেই মানবিক পৃথিবীর জন্য, যেখানে ভালোবাসা, মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা কোনো মানুষের কাছেই অনিশ্চিত হওয়ার কথা নয়।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, সামরিক সামর্থ্য কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাবে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় সে কতটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কতটা মানবিক হতে পারে এবং একজন অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষায় কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে।

আমরা সত্য জানতে চাই। আমরা জবাবদিহি চাই। আমরা ন্যায়বিচার চাই।

কারণ, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক অস্বস্তি নেই, আর ন্যায়বিচারের চেয়ে পবিত্র কোনো দায়িত্ব নেই।

মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।