বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ। রাজস্থানের কোটা রেলস্টেশনে পুনে-জয়পুর এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন হরিয়ানার সোনিপতের ১৭ বছর বয়সী ফুল সিং, বিহারের বেগুসরাইয়ের ২২ বছর বয়সী হৃতিক কুমার ওরফে রোশন এবং সোনিপতের ১৮ বছর বয়সী রেহান। মুম্বাই পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্থান পুলিশের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স (এজিটিএফ) ও কোটা সিটি পুলিশের একটি যৌথ দল তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ভাড়াটে বন্দুকধারী হতে পারেন। অন্যজন গুলি চালানোর পর তাঁদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা তাঁদের ভূমিকা, হামলার পেছনের উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
পরিকল্পিত হামলার সন্দেহ পুলিশের
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা মনে করছেন, হামলাকারীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন। গুলি চালানোর আগে তাঁরা টাইগার শ্রফের চলাফেরার ওপর নজর রেখেছিলেন বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। অভিনেতার নিয়মিত যাতায়াতের সময়সূচি পর্যবেক্ষণ করে হামলার উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, টাইগার শ্রফ প্রতি রোববার মুম্বাইয়ের জুহু এলাকার একটি ফুটবল মাঠে যেতেন। সেখান থেকে গাড়িতে করে ফেরার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে পুলিশের হাতে থাকা তথ্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার পর সন্দেহভাজনদের পালিয়ে যাওয়ার পথ নিয়েও তদন্ত চলছে। পুলিশের ধারণা, গুলি চালানোর পর তাঁরা ভিলে পার্লে ও আন্ধেরি হয়ে এসভি রোড ধরে পালিয়ে যান। পরে আন্ধেরি পশ্চিম রেলস্টেশনের কাছে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে বোরিভালির উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তাঁরা মহারাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী গুজরাটেও গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ঘটনার পর মুম্বাই পুলিশ সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তল্লাশি জোরদার করে। এ সময় তাঁদের কয়েকজনের ছবি প্রকাশ্যে আসে। প্রকাশিত একটি ছবিতে দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের একজনের মাথায় কালো টুপি ছিল। এসব ছবি ও অন্যান্য তথ্যের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনদের গতিবিধি অনুসরণ করেন বলে জানা গেছে।
নিরাপত্তার আশ্বাস উপমুখ্যমন্ত্রীর
টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনায় মুম্বাইয়ে অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাং-সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে।
রোববার গভীর রাতে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় টাইগার শ্রফের বাসায় যান শিন্ডে। সেখানে তিনি অভিনেতার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে তাঁদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
শিন্ডে বলেন, মুম্বাইয়ে অপরাধী চক্রের তৎপরতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এসব গোষ্ঠীর শিকড় আবারও উপড়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি নব্বইয়ের দশকে শহরটিতে গ্যাং-সংঘাতের সময় অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তোলেন।
তাঁর বক্তব্য, অতীতে যেভাবে অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজনে আবারও সেভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনাতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
জুহুতে গুলির ঘটনায় আহত দুজন
রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা। ৩৬ বছর বয়সী এই অভিনেতা অক্ষত থাকলেও ঘটনায় তাঁর গাড়িচালক ও আরও একজন আহত হন। হামলার ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং এই হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে পোস্টটির সত্যতা পুলিশ এখনো নিশ্চিত করেনি। ফলে ওই দাবিকে তদন্তে যাচাইযোগ্য একটি সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে; এর ভিত্তিতে হামলার দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম এর আগেও বিভিন্ন অপরাধ ও হুমকির ঘটনার সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো অপরাধের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণের জন্য তদন্তে পাওয়া প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।
টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন পুলিশের সামনে প্রধান কাজ হলো হামলার পেছনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, সন্দেহভাজনদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের শনাক্ত করা। একই সঙ্গে অভিনেতা ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মুম্বাইয়ে অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


