আরও ৫ জনের মৃত্যু দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ছাড়াল ১২০০

দেশে হামের সংক্রমণ ও এ-সংক্রান্ত উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২০১ জনে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৯৭ জন। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। বুলেটিনে বলা হয়েছে, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৪২ জন রোগী। সংক্রমণ ও হাসপাতালে রোগী ভর্তির এই চিত্র জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে রোগীর চাপ বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগের। এ বিভাগে নতুন করে ৫৮৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯২ জন ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে। সিলেটে ভর্তি হয়েছেন ১৩৬ জন এবং বরিশালে ১২৩ জন।

এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৭৩ জন, ময়মনসিংহে ৬৯ জন, রাজশাহীতে ৪০ জন এবং রংপুরে ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব বিভাগ মিলিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৪২।

বিভাগভিত্তিক এই চিত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি বলে দেখা যাচ্ছে। তবে শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার প্রকৃত সংক্রমণের বিস্তার পুরোপুরি বোঝা যায় না। পরীক্ষার সুযোগ, রোগী শনাক্তের হার, চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রবণতা এবং হাসপাতালের সক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার ৬৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪২ জন।

একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৫১ জনে। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষাসহ নির্ধারিত চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৩ হাজার ১৫৭ জন।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা এবং নিশ্চিতভাবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক নয়। হামের মতো উপসর্গ দেখা দিলেই প্রত্যেককে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাই রোগ নির্ণয়ের জন্য যথাযথ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

হাম প্রতিরোধে টিকাদান ও দ্রুত চিকিৎসা জরুরি

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারেন। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এ রোগের পরিচিত লক্ষণ। তবে শুরুতে এসব উপসর্গ অন্য রোগের সঙ্গেও মিলে যেতে পারে।

শিশুদের মধ্যে হাম গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি এবং প্রয়োজনীয় টিকা না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার মতো জটিলতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।

হাম প্রতিরোধে নিয়ম অনুযায়ী টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। কোনো শিশুর টিকাদানের ইতিহাস অসম্পূর্ণ হলে অভিভাবকদের নিকটস্থ টিকাকেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে করণীয় জেনে নেওয়া প্রয়োজন। জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি দেখা দিলে কিংবা হামের সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শ্বাসকষ্ট, খেতে বা পান করতে না পারা, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজতা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

হামের সন্দেহভাজন রোগীকে অন্যদের থেকে যথাসম্ভব আলাদা রাখা এবং হাসপাতালে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে উপসর্গের কথা জানানো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে রোগী শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নজরদারি, টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তির তথ্য উঠে এসেছে। তবে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া সব ক্ষেত্রেই পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর হিসাব আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি। সংক্রমণের প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং মৃত্যুহার কমাতে নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়, দ্রুত চিকিৎসা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।