বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপ এবং পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম হতে পারে ‘অর্ণব’। আবহাওয়ার বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ দিকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ কিংবা ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলেও ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড উপকূল থেকে সৃষ্ট লঘুচাপটি ইতোমধ্যে আন্দামান সাগর এলাকায় অবস্থান করছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) থেকে শনিবারের (২৪ অক্টোবর) মধ্যে এটি আরও ঘনীভূত হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, লঘুচাপটি আন্দামান সাগর থেকে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারে। সেখানে অনুকূল পরিবেশ পেলে এটি আরও শক্তি সঞ্চয় করে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেটি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নিয়ে ভিন্ন পূর্বাভাস
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল জিএফএসের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবরের দিকে লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এরপর উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আরও শক্তিশালী হয়ে ২৫ অক্টোবর নাগাদ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মডেলের পূর্বাভাসে ভারতের ওড়িশা উপকূলকে সম্ভাব্য আঘাতের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাতের দিকে ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের কাছাকাছি এলাকায় ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে।
অন্যদিকে, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসভিত্তিক মাধ্যম উইন্ডির তথ্য বলছে, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির গতিপথ কিছুটা দক্ষিণে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউরোপীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল ইসিএমডব্লিউএফের হিসাবেও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে এই মডেলের পূর্বাভাসে সময় ও আঘাতের স্থান নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ইউরোপীয় মডেল অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে। সেটি ২৬ অক্টোবরের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ২৮ অক্টোবর দুপুরের দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়া সংলগ্ন উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে।
তবে এসব পূর্বাভাস এখনো সম্ভাবনানির্ভর। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি, গতিপথ এবং স্থলভাগে আঘাত হানার সময় আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। ফলে কোন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উপকূলে কী প্রভাব পড়তে পারে
প্রাথমিক পূর্বাভাসে ঘূর্ণিঝড়টির মূল আঘাত ভারতের পূর্ব উপকূলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়া এবং সমুদ্র উত্তাল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে ঘূর্ণিঝড়টির চূড়ান্ত গতিপথ, শক্তি ও অবস্থানের ওপর।
আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, জেলে এবং সমুদ্রগামী নৌযানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত আবহাওয়া বার্তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নিম্নচাপটি আরও শক্তিশালী হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্কবার্তা দিতে পারে।
যেভাবে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়
বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য একটি পূর্বনির্ধারিত তালিকা অনুসরণ করা হয়। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি দেশ এই তালিকায় নাম প্রস্তাব করে থাকে।
দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও ইরান।
দেশগুলোর প্রস্তাবিত নাম নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে ব্যবহার করা হয়। কোনো নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ তালিকা অনুযায়ী তার নাম নির্ধারণ করে।
প্রদত্ত পূর্বাভাসে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘অর্ণব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের দেওয়া এই নামের অর্থ ‘সমুদ্র’ বা ‘সাগর’। তবে আবহাওয়া ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার পরই তার নাম নিশ্চিত করা হয়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের শক্তি ও গতিপথ নির্ধারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি এবং বাতাসের প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব উপাদানের পরিবর্তনের কারণে একই আবহাওয়া ব্যবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাসে ভিন্ন ফলাফল দেখা যেতে পারে।
ফলে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, শক্তি এবং আঘাতের সময় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া বিভাগের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাসের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।


