দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম আবার বাড়বে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবহণ, মজুত ও বিপণন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা দাম সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন। তাঁদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণশুনানির আয়োজন করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের এলপিজির ভোক্তাপর্যায়ের মূল্য সংশোধনের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে।
গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একবারে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক খরচের ওপর সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবি গ্রহণ করলেই যে সিলিন্ডারের দাম বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। গণশুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনার পর কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
ব্যয় ও মুনাফার প্রস্তাব যাচাই করবে কমিশন
এলপিজির ভোক্তাপর্যায়ের দাম নির্ধারণে আমদানি থেকে শুরু করে বোতলজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহণ ও খুচরা বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের নতুন প্রস্তাবে এসব পর্যায়ের খরচ ও লভ্যাংশ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজনের বক্তব্য ও তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে কী ধরনের হিসাব উপস্থাপন করেন, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যয় বাস্তবসম্মত কি না এবং তার কতটা ভোক্তাপর্যায়ের দামে যুক্তিসংগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেটিও বিবেচ্য।
এলপিজির বাজারে আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহণ ব্যয়ের পরিবর্তন দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সিলিন্ডার পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণব্যবস্থার খরচও খুচরা মূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব ব্যয়ের কোন খাতে কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তা নির্দিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম পরিচালনার যৌক্তিক ব্যয় বিবেচনার পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণভাবে দেখা প্রয়োজন। গণশুনানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যুক্তি যাচাই করে কমিশন নতুন মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সর্বশেষ নির্ধারিত দামে কত টাকায় মিলছে এলপিজি
গত ৪ অক্টোবরের সিদ্ধান্তে ৫.৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আনুপাতিক হারে বাড়ানো হয়। তখন প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। পাশাপাশি অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়।
বিইআরসির ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল নিম্নরূপ:
| সিলিন্ডারের ওজন | নির্ধারিত দাম |
|---|---|
| ৫.৫ কেজি | ৮৪২ টাকা |
| ১২ কেজি | ১,৮৩৭ টাকা |
| ১২.৫ কেজি | ১,৯১৩ টাকা |
| ১৫ কেজি | ২,২৯৬ টাকা |
| ১৬ কেজি | ২,৪৪৯ টাকা |
| ১৮ কেজি | ২,৭৫৫ টাকা |
| ২০ কেজি | ৩,০৬১ টাকা |
| ২২ কেজি | ৩,৩৬৭ টাকা |
| ২৫ কেজি | ৩,৮২৭ টাকা |
| ৩০ কেজি | ৪,৫৯২ টাকা |
| ৩৩ কেজি | ৫,০৫১ টাকা |
| ৩৫ কেজি | ৫,৩৫৭ টাকা |
| ৪৫ কেজি | ৬,৮৮৮ টাকা |
অন্যদিকে, যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দাম বাড়লে চাপে পড়তে পারে ভোক্তারা
রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজি এখন বহু পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ না থাকা অনেক বাসা, ছোট খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এলপিজির দাম বাড়লে শুধু পরিবারের রান্নার খরচ নয়, খাবার প্রস্তুত ও বিক্রির ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বারবার দাম বাড়ার চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আবার দাম নির্ধারণের পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও ভোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা তদারকির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় বৃহস্পতিবারের গণশুনানি এলপিজির মূল্য নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের ব্যয়সংক্রান্ত দাবি এবং ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে শুনানির পর দাম বাড়বে, কমবে, নাকি অপরিবর্তিত থাকবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন ভোক্তামূল্য নির্ধারণের বিষয়টি।


