মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের একজন সহযোদ্ধার প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুজ্জামান মিন্টুর বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির কোনো অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না। একই সঙ্গে যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে নুরুজ্জামান মিন্টুর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে হামলার শিকার হন শাকিল
স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাকিল ইসলাম। পথে নূর একাডেমির সামনে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
প্রাণ বাঁচাতে শাকিল দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে মোটরসাইকেলে করে তাঁকে ধাওয়া করা হয়। একপর্যায়ে শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাঁকে ধরে ফেলে হামলাকারীরা। সেখানে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেওয়া হয় শাকিলকে।
সেখানে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাত ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। শাকিলের মৃত্যুর খবরে গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
জানাজা ও দাফন সম্পন্ন
শাকিলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মঙ্গলবার সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা হাসপাতালে যান।
এদিন দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁর মরদেহ নাটোরের গুরুদাসপুরে নেওয়া হয়। রাত ৮টার দিকে মরদেহ সেখানে পৌঁছালে স্বজন, সহকর্মী ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এরপর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পুরানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে শাকিলকে দাফন করা হয়।
ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন এমপি
শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ। তাঁর ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু এ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এ সময় আব্দুল আজিজ বলেন, হামলার পর থেকেই তিনি পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছিলেন। শাকিলের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খরচও তিনি দিয়েছেন। তবে শাকিলের মৃত্যু হবে, এমনটা তিনি ধারণা করেননি বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অপরাধী নিজের সন্তান হলেও প্রকৃত সাক্ষ্যপ্রমাণে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
সংসদ সদস্যের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে। তবে মামলার অভিযোগ প্রমাণের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
তিন দিনের রিমান্ডে নুরুজ্জামান মিন্টু
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান জানান, গত ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আট থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অন্য আসামিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান ওসি। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত সব আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শাকিল হত্যার ঘটনায় একদিকে যেমন পুলিশি তদন্ত চলছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত মিন্টুর বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এখন তদন্তে হামলার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা, ঘটনার পেছনের কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বেরিয়ে আসে কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে স্থানীয়দের।


