বাংলাদেশ পুলিশে নতুন করে ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। এর মধ্যে ৪ হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) এবং ১০ হাজার কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ৪০০ থেকে ৫০০ জন নিয়োগের জন্য বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের জনবল বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় পুলিশের নতুন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসআই ও কনস্টেবল পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসআই পদে শতভাগ সরাসরি নিয়োগ
নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে এসআই পদে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, উপপরিদর্শক পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। সেই নিয়ম কার্যকর থাকলে ৪ হাজার এসআই পদের মধ্যে ২ হাজার পদে সরাসরি নিয়োগ এবং অন্য ২ হাজার পদে বিভাগীয় সদস্যদের পদোন্নতির সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।
তবে এবার সেই বিধানে পরিবর্তন এনে চার হাজার পদেই সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) সংশোধন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে প্রচলিত নিয়মে পদোন্নতির জন্য সংরক্ষিত অংশটিও এবার সরাসরি নিয়োগের আওতায় আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুলিশের ইতিহাসে একসঙ্গে এতসংখ্যক এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ এটাই প্রথম। তবে সিদ্ধান্তটি আপাতত একবারের জন্য কার্যকর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। ভবিষ্যতে প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি না, তা সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পুলিশের কার্যক্রম সচল রাখতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর বিষয়টি সচিব কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়।
১০ হাজার কনস্টেবলও নিয়োগ পাবেন
এসআই পদের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতে ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন এই নিয়োগের ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের জনবল বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত টহল, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং জনসাধারণকে পুলিশি সেবা দেওয়ার মতো কাজে অতিরিক্ত সদস্যদের কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তবে এসব ক্ষেত্রে জনবল বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে নিয়োগের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের ওপরও।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, ৪ হাজার এসআই ও ১০ হাজার কনস্টেবল—এই দুই পদে মোট ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। যদিও আবেদন শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ, বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সক্ষমতার মানদণ্ড এবং আবেদনপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
প্রার্থীদের এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতা বা আবেদনের সময়সীমাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পদোন্নতির সুযোগ কমায় অসন্তোষের আশঙ্কা
এসআই পদে সব নিয়োগ সরাসরি পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত পুলিশের অভ্যন্তরে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে কনস্টেবল ও অন্যান্য পদে কর্মরত যেসব সদস্য দীর্ঘদিন ধরে বিভাগীয় পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রচলিত ব্যবস্থায় বিভাগীয় পদোন্নতি পুলিশের সদস্যদের পেশাগত অগ্রগতি এবং উচ্চতর দায়িত্ব গ্রহণের অন্যতম পথ। এবার সেই সুযোগের জন্য নির্ধারিত পদগুলোতেও সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
পুলিশ বাহিনীতে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন যোগ্য প্রার্থীদের জন্য প্রবেশের পথ উন্মুক্ত রাখাও প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে পুলিশের সদস্যদের মনোবল, কর্মদক্ষতা কিংবা দায়িত্ব পালনে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি নির্ভর করবে নিয়োগনীতির বাস্তবায়ন এবং বিভাগীয় পদোন্নতির ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপর।
বিশেষ বিসিএসে ৪০০ থেকে ৫০০ এএসপি নিয়োগের পরিকল্পনা
এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার পদে জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্য বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়োগ ৫২তম বিসিএসের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এএসপি পদ পুলিশের কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বশীল পর্যায়। মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব, অপরাধ দমন কার্যক্রমের তদারকি, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং অধীনস্থ সদস্যদের কার্যক্রম পরিচালনার মতো দায়িত্ব পালনে এ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখেন। ফলে এ পদে পর্যাপ্ত জনবল থাকা পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন এএসপিদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময়কাল কিছুটা কমিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রশিক্ষণের মেয়াদ কতটা কমানো হবে, কোন নিয়মে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং বিশেষ বিসিএসের পরীক্ষার সময়সূচি কবে ঘোষণা করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
কেন এই বিপুল নিয়োগের উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পুলিশের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নতুন নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসনের সক্ষমতা জোরদার করা এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সদস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এ ছাড়া পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিয়োগের সময় প্রার্থীদের পরিচয়, অতীত কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কনস্টেবল, এসআই ও পুলিশ সার্জেন্ট পদে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই সংখ্যা পুলিশ বাহিনীর মোট সদস্যের প্রায় অর্ধেক। তবে এ পরিসংখ্যানের ভিত্তি ও শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরিকল্পনা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
নিয়োগে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
পুলিশে বিপুলসংখ্যক নতুন সদস্য যুক্ত হলে বাহিনীর জনবলসংকট মোকাবিলায় সহায়তা মিলতে পারে। তবে নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, প্রশিক্ষণের মান, পেশাগত সততা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এসআই ও এএসপির মতো দায়িত্বশীল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন সম্পর্কে জ্ঞান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একইভাবে কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, সততা ও জনসেবার মানসিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে জনবল বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্ব পালনে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করার ওপর। পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরে পদোন্নতির সুযোগ ও নতুন নিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে সদস্যদের মনোবল ধরে রাখতেও তা সহায়ক হতে পারে।
আপাতত ১৪ হাজার এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদনের পরবর্তী ধাপ এবং বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি নিয়োগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার সময়সূচি ও অন্যান্য শর্ত প্রকাশিত হলে আগ্রহী প্রার্থীরা আবেদনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন।


