বাবার হাত চেপে ধরে বুকেই গুলি, মেয়ের মুখে হত্যার বিবরণ

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বাড়ির কাছেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে খোরশেদ আলম (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে। পরিবারের অভিযোগ, ইটভাটায় মাটি সরবরাহের ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

নিহত খোরশেদ আলম লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দিলশাদপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। পেশায় তিনি ইটভাটায় মাটি বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার বেলা দেড়টার দিকে বাড়ির কাছেই একটি সড়কের পাশে তাঁকে গুলি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় খোরশেদ ডাব খাচ্ছিলেন। এ সময় তিনজন ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে হামলা চালান। তাঁদের মধ্যে দুজন তাঁর দুই হাত চেপে ধরেন। এরপর তাঁর বুকের ওপর থেকে শার্ট সরিয়ে আরেকজন বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাবাকে হারানোর ঘটনায় শোকাহত তাঁর মেয়ে প্রেমা আক্তার (১৯)। বৃহস্পতিবার সকালে মুঠোফোনে কথা বলার সময় তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনেছেন। তাঁর বাবার সঙ্গে থাকা এক বন্ধুও তাঁকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানিয়েছেন।

প্রেমার অভিযোগ, তাঁর বাবাকে গুলি করেছেন মো. ওয়ালিদ। ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জানান তিনি।

বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ

নিহত খোরশেদের স্ত্রী মুক্তা বেগম, যিনি আকলিমা আক্তার নামেও পরিচিত, সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার দুপুরে মোরশেদ ও মজিদ নামের দুজন তাঁর স্বামীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। বাড়ি থেকে কিছু দূর যাওয়ার পরই তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। পরে দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীর বুক রক্তে ভেজা অবস্থায় দেখতে পান।

স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় খোরশেদকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মুক্তা বেগমের অভিযোগ, মাটির ব্যবসা নিয়ে ওয়ালিদ নামের এক ব্যক্তি এর আগেও তাঁর স্বামীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছিলেন। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে তাঁর ধারণা।

তবে ব্যবসায়িক বিরোধের অভিযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা উদ্ধার

খোরশেদের বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১৫০ গজ। সড়কের পাশে একটি বাড়ির ফটকসংলগ্ন স্থানে তাঁকে গুলি করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলের কাছেই বসবাস করেন গ্রাম পুলিশ নূর মোহাম্মদ চৌধুরী। তিনি জানান, গুলির শব্দ খুব বেশি শোনা যায়নি। তাঁর ধারণা, খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির খোসাগুলোও কাছাকাছি স্থানে পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলি উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে দুটি খালি খোসা এবং অন্যটি অব্যবহৃত গুলি।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অরূপ পাল জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই খোরশেদের মৃত্যু হয়। তাঁর বুকের মাঝামাঝি অংশে দুটি গুলির ক্ষত ছিল। এর মধ্যে একটি ক্ষত ছোট এবং অন্যটি তুলনামূলক বড় ছিল।

মামলায় আটজনের নাম, গ্রেপ্তার দুজন

এ ঘটনায় বুধবার রাতে খোরশেদের স্ত্রী মুক্তা বেগম বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় মো. ওয়ালিদ ও মো. সোহাগসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা হলেন দিলশাদপুর গ্রামের ইব্রাহিম ছোট্টু (৪৪) এবং রাধাপুর গ্রামের তোফায়েল আহমেদের ছেলে মাসুদ রানা (২৬)।

লক্ষ্মীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়েক দিনের ব্যবধানে আরেকটি হত্যাকাণ্ড

এদিকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় কয়েক দিনের ব্যবধানে আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার দিবাগত রাত একটার দিকে পূর্ব নন্দনপুর গ্রামের একটি সুপারিবাগান থেকে জাকির হোসেন নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

জাকির পূর্ব নন্দনপুর এলাকার তোফায়েল আহমেদের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল, ভুক্তভোগীদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য বিরোধের ধরন আলাদা হলেও উভয় ঘটনাতেই অপরাধের পেছনের কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য জানায়নি।

খোরশেদ আলম হত্যার ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।