হুতিগোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এসব হামলার কথা জানান। হুতিদের পরিচালিত আল-মাসিরা টেলিভিশনে বিবৃতিটি সম্প্রচার করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এ খবর জানিয়েছে।
ইয়াহিয়া সারির দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে অবস্থিত রাস তানুরা তেল শোধনাগার এবং আবকাইক শহরে সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। একই অভিযানের অংশ হিসেবে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত রাবিগ তেল শোধনাগারেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো দেশটির অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে রাস তানুরা ও আবকাইকের মতো স্থাপনাগুলো তেল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে এসব স্থাপনায় হামলার দাবি আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
হুতি মুখপাত্র আরও জানান, সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম শহরে অবস্থিত কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। তার দাবি, ড্রোন হামলার কারণে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন নাজরান অঞ্চলে দেশটির সামরিক বাহিনীর একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন ইয়াহিয়া সারি। ওই হামলায় সৌদি সামরিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ও কর্মকর্তা হতাহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে হুতিগোষ্ঠী। তবে হতাহতের সংখ্যা কিংবা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, হুতিদের হামলার দাবির আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রিয়াদের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। জোটের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়।
এর আগে একই জোট আরও তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে দুটি রিয়াদ এবং একটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দিকে ছোড়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, হুতিগোষ্ঠী অভিযোগ করেছে, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ২৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে এই হতাহতের তথ্যও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সৌদি আরব ও হুতিগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষের মধ্যে একের পর এক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের সূত্রপাত ২০১৪ সালের শেষ দিকে। সে সময় হুতিগোষ্ঠী রাজধানী সানা দখল করে নেয় এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার কার্যত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে ২০১৫ সালে ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং এতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষ জড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘ এই যুদ্ধে ইয়েমেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও জ্বালানি অবকাঠামোও বিভিন্ন সময়ে হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার মতো ঘটনা শুধু দুই পক্ষের সামরিক উত্তেজনার বিষয় নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বিমান চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
তবে এবার ছয়টি স্থানে হামলার যে দাবি হুতিগোষ্ঠী করেছে, তার সব কটির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার প্রকৃত ব্যাপ্তি, ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।



