বাংলার মাটির ঘ্রাণে, লোকসুরের মায়ায় যিনি জয় করেছিলেন বিশ্বসংগীতের হৃদয়
“শোনো গো দখিনা হাওয়া, প্রেম করেছি আমি…”
কিংবা—
“বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি…”
কয়েকটি পংক্তি, কয়েকটি সুরের মূর্ছনা! অথচ কী অপার মাধুর্য, কী গভীর আবেগ, কী অসাধারণ দরদ! এই সুরের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে বাংলার নদী, মেঠোপথ, মাঝির কণ্ঠ, গ্রামের নিঝুম দুপুর আর বিরহী হৃদয়ের না-বলা কথা।
যিনি সুরের মাধ্যমে বাংলার মাটির ঘ্রাণ পৌঁছে দিয়েছিলেন উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে, যিনি লোকসংগীতকে আধুনিক সংগীতের আঙিনায় এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধার সুরসম্রাট শচীন দেব বর্মন—শচীন কর্তা।
আজ ৩১ অক্টোবর, এই কিংবদন্তি সংগীতস্রষ্টার প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে থেমে গিয়েছিল তাঁর জীবনযাত্রা। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর সুরের অভিযাত্রা। মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরও তাঁর সৃষ্টি সমানভাবে জীবন্ত, আবেদনময় ও চিরনতুন।
জন্ম ও শৈশব
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা শহরের এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মন। তাঁর পিতা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মন ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের বংশধর এবং মাতা রাজকুমারী নির্মলা দেবী ছিলেন মণিপুরের রাজপরিবারের কন্যা।
রাজকীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়েও শচীন দেব বর্মনের হৃদয় পড়ে ছিল সাধারণ মানুষের জীবনে, বাংলার প্রকৃতিতে এবং মাটির গানে।
কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ১৯২০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে একসময় প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে নিয়ে যায় সুরের বিশাল জগতে।
সুরসাধনার হাতেখড়ি ও সংগীতজীবনের সূচনা
শচীন দেব বর্মনের সংগীতজীবন ছিল দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও নিরন্তর অনুসন্ধানের এক অনন্য ইতিহাস। শৈশব থেকেই তিনি মুগ্ধ ছিলেন বাংলার লোকসংগীতের প্রতি। বিশেষ করে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, সারি, ধামাইল ও পল্লিগীতির সুর তাঁর সংগীতচেতনার ভিত নির্মাণ করেছিল।
প্রথাগত সংগীতশিক্ষায় তিনি ওস্তাদ কে সি দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খান এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মতো সংগীতগুণীদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
১৯২০-এর দশকের শেষদিকে কলকাতা বেতারে তাঁর সংগীত পরিবেশনা শুরু হয়। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। একদিকে শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা, অন্যদিকে লোকসংগীতের সহজিয়া আবেগ—এই দুই ধারার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক সুরভুবন।
১৯৩৭ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘রাজগী’র সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে কলকাতার সংগীতাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে ১৯৪৪ সালে পাড়ি জমান বোম্বে, বর্তমান মুম্বাইয়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সংগীতজীবনের আন্তর্জাতিক পরিচিতির এক নতুন অধ্যায়।
মুম্বাই চলচ্চিত্রে সুরের রাজত্ব
মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে শচীন দেব বর্মনের আবির্ভাব ছিল এক নতুন সংগীতধারার সূচনা। প্রচলিত সংগীতের কাঠামোর মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে তিনি লোকসুর, শাস্ত্রীয় সংগীত, পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র এবং আধুনিক সংগীতায়োজনের এক বিস্ময়কর মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।
তাঁর সুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সরলতা। অল্প কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র, স্বল্প আয়োজন, অথচ গভীর আবেগ ও অসামান্য সুরবিন্যাস—এটাই ছিল তাঁর সংগীতের নিজস্ব পরিচয়।
‘দো ভাই’, ‘মুনিমজি’, ‘পেয়িং গেস্ট’, ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’ এবং ‘অভিমান’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত পরিচালনা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
‘পিয়াসা’ চলচ্চিত্রের বিষণ্ন আবহ, ‘গাইড’-এর সুরের বৈচিত্র্য কিংবা ‘আরাধনা’র রোমান্টিক আবেদন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি প্রমাণ করেছেন, সংগীত শুধু চলচ্চিত্রের অনুষঙ্গ নয়, চলচ্চিত্রের আত্মাও হতে পারে।
সুরের জাদুকরের কণ্ঠে অমর সৃষ্টি
শচীন কর্তা শুধু অসাধারণ সুরকারই ছিলেন না, ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের একজন কণ্ঠশিল্পীও। তাঁর কণ্ঠে ছিল একধরনের গ্রামীণ মাধুর্য, সহজিয়া দরদ এবং গভীর আবেগ।
তাঁর নিজের কণ্ঠে গাওয়া ‘ওরে সুজন নাইয়া’, ‘শোনো গো দখিনা হাওয়া’, ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ কিংবা ‘তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে অমলিন।
হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর সুরে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। ‘সুন মেরে বন্ধু রে’, ‘ওয়াহাঁ কৌন হ্যায় তেরা’, ‘গাতা রহে মেরা দিল’, ‘পিয়া তোসে ন্যায়না লাগে রে’, ‘আজ ফির জিনে কি তামান্না হ্যায়’—এমন অসংখ্য গান সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা। মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, গীতা দত্ত, মান্না দে, তালাত মাহমুদ, মুকেশসহ অসংখ্য কিংবদন্তি শিল্পী তাঁর সুরে গান গেয়ে নিজেদের শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
শচীন কর্তা শিল্পীর কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য বুঝতেন। কে কোন গানের জন্য উপযুক্ত, কোন কণ্ঠে কোন আবেগ সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পাবে—তা নির্ধারণে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল।
কিশোর কুমারের সঙ্গে তাঁর সংগীতের রসায়ন ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের যুগলবন্দিতে সৃষ্টি হয়েছে এমন সব গান, যা আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
পুত্র আর ডি বর্মন: আরেক সংগীতবিস্ময়ের জন্ম
শচীন দেব বর্মনের পারিবারিক জীবনেও সংগীত ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। স্ত্রী মীরা দেব বর্মনের সঙ্গে তাঁর সংসারে জন্ম নেন আরেক সংগীতপ্রতিভা—রাহুল দেব বর্মন, যিনি সংগীতজগতে আর ডি বর্মন বা পঞ্চম নামে পরিচিত।
পিতার কাছ থেকে সংগীতের গভীরতা ও সুরসৃষ্টির ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পেলেও আর ডি বর্মন নিজের স্বতন্ত্র আধুনিক সংগীতধারা নির্মাণ করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে পিতা-পুত্রের এই দুই প্রজন্মের অবদান এক বিস্ময়কর ইতিহাস।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
শচীন দেব বর্মনের অসামান্য সংগীতপ্রতিভা দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১৯৫৪ সালে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে সংগীত পরিচালনায় পান সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। পরবর্তী সময়ে ‘অভিমান’ চলচ্চিত্রের জন্যও তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন।
তবে পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে তাঁর সংগীতপ্রতিভার প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। মানুষের হৃদয়ে তাঁর যে স্থায়ী আসন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
শচীন কর্তা: বাংলার শেকড় থেকে বিশ্বসংগীতের আঙিনায়
শচীন দেব বর্মনের সংগীতের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে উপলব্ধি করা যায়—তিনি কখনো নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি।
মুম্বাইয়ের আধুনিক চলচ্চিত্রের জৌলুশের মধ্যেও তাঁর সুরে বারবার ফিরে এসেছে পূর্ববঙ্গের নদী, নৌকা, মাঝি, ভাটিয়ালি আর পল্লিজীবনের অনাড়ম্বর সৌন্দর্য।
তিনি জানতেন, সংগীতের প্রাণ থাকে মানুষের জীবনে। তাই তাঁর সুরে যেমন ছিল রাজকীয় আভিজাত্য, তেমনি ছিল সাধারণ মানুষের মনের ভাষা।
কলকাতায় তিনি পরিচিত ছিলেন ‘শচীন কর্তা’ নামে, আর মুম্বাইয়ের সংগীতজগতে ভালোবাসার সম্বোধন ছিল ‘বর্মন দাদা’। নামের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁর পরিচয় ছিল একটাই—তিনি সুরের মানুষ, সুরের সাধক।
১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে ৬৯ বছর বয়সে এই মহান সংগীতস্রষ্টা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতে সৃষ্টি হয় এক অপূরণীয় শূন্যতা।
কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তাঁর সৃষ্টিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।
আজও যখন কোনো নির্জন দুপুরে বেতারে ভেসে আসে ‘শোনো গো দখিনা হাওয়া’, যখন দূর কোনো নদীর বুকে মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালির সুর ওঠে, কিংবা পুরোনো দিনের কোনো গান অজান্তেই চোখ ভিজিয়ে দেয়, তখন মনে হয়—শচীন কর্তা কোথাও হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের অনুভবে, আমাদের সংগীতের প্রতিটি স্পন্দনে।
কুমিল্লার মাটিতে জন্ম নেওয়া সেই রাজবংশের সন্তান তাঁর সুরের ঐশ্বর্যে জয় করেছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়। বাংলার লোকজ সংগীতকে বিশ্বসংগীতের দরবারে পৌঁছে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, শেকড় যত গভীরে প্রোথিত থাকে, শিল্পের ডালপালা তত দূরে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি শুধু একজন সংগীত পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন একটি সংগীতযুগের নির্মাতা। তিনি শুধু সুর সৃষ্টি করেননি, মানুষের অনুভূতিকে সুরের ভাষা দিয়েছিলেন।
শচীন দেব বর্মন তাই কোনো নির্দিষ্ট সময়ের শিল্পী নন, তিনি চিরকালের।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি বাংলার এই অমর সন্তানকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, সুরসম্রাট। প্রণাম, প্রিয় শচীন কর্তা।
আপনার সুরের মায়া বেঁচে থাকুক বাংলার নদী, মাটি, মানুষ আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয়ে।


