খুলনার রূপসা উপজেলার আঠারোবাঁকী নদীর চর থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে নদী থেকে একটি মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে একই এলাকায় দ্বিতীয় মরদেহের সন্ধান পান পুলিশ সদস্যরা। নিহত দুজনের মাথায় রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। তাঁদের মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের মোছাব্বরপুর গ্রামের সিংহের চর এলাকায় নদীর চর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রূপসা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের আব্দুল্লাহর ছেলে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) এবং সিংহের চর এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম (৩০)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আঠারোবাঁকী নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে তাঁরা বিষয়টি রূপসা থানা পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করে। এ সময় প্রথম মরদেহটির কাছাকাছি এলাকায় আরও একটি মরদেহ দেখতে পান পুলিশ সদস্যরা।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে নদীর চর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর কাদার মধ্যে প্রথমে একটি মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় দ্বিতীয় মরদেহটিও নজরে আসে। মরদেহ দুটি নদীর চরে আটকে ছিল। সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নদীর দুই পাড়ে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। একই স্থানে পরপর দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
নিহতদের একজন ছিলেন নৌকার মাঝি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত মেহেদী হাসান সোহাগ জেলখানা ঘাটের মাঝি হিসেবে কাজ করতেন। অন্যদিকে পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি ‘বি কোম্পানি’ নামের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা কিংবা এই ঘটনার সঙ্গে ওই পরিচয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুই যুবকের মাথায় রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন পাওয়ায় তাঁদের মৃত্যুর ধরন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব ক্ষত ধারালো অস্ত্রের আঘাত, অন্য কোনো আঘাত নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। একইভাবে তাঁদের অন্য কোথাও হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, নাকি নদীতেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।
রূপসা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর আলম বলেন, সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে স্থানীয় লোকজন নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি উদ্ধারের সময় একই এলাকায় আরও একটি মরদেহ দেখতে পায়। পরে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খানও নদী থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পুলিশ। পাশাপাশি নিহতদের মৃত্যুর সময়, তাঁদের শরীরে থাকা আঘাতের ধরন এবং ঘটনার আগে তাঁদের চলাফেরা ও যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
খুলনায় দুই দিনে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড
এদিকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে গত দুই দিনে খুলনা মহানগরীতে আরও দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পৃথক এসব ঘটনায় ধারালো অস্ত্রের হামলায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
গত রোববার সন্ধ্যায় নগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়মহল এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হন সৈয়দ হুমায়ুন কবির। তিনি খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
এর আগের দিন শনিবার রাতে নগরীর লবণচরা থানার দারোগাপাড়া এলাকায় চাপাতির কোপে শহিদুল (৩৫) নামের এক যুবক নিহত হন।
পরপর এসব হত্যাকাণ্ড এবং রূপসার নদী থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা। বিশেষ করে আঠারোবাঁকী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুই যুবকের পরিচিতি, তাঁদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং মৃত্যুর আগে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হলে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে অগ্রগতি হতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের পরবর্তী তথ্যের ওপর নির্ভর করছে এই জোড়া মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র।


