দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৩১৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষায় ৮২ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন শনাক্ত ও আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত এক স্বাস্থ্য বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে ছয়টি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ লাখ ৩২ হাজার ৮২৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ২৪ হাজার ৭৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। উপসর্গযুক্ত ও নিশ্চিত আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মোট ২ লাখ ৭ হাজার ৪২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫২ জন।
মৃত্যুর হিসাবেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১৫৮ জন। অন্যদিকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে ১০৫ জনের। অর্থাৎ, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি
গত ২৪ ঘণ্টার বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে নতুন রোগীর সংখ্যা ৫৪৬। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩৬, সিলেটে ১৪২, বরিশালে ১৩২, ময়মনসিংহে ১০০, খুলনায় ৯৪, রংপুরে ৩৫ এবং রাজশাহী বিভাগে ৩৩ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
বিভাগভিত্তিক এই চিত্রে রাজধানীসহ ঢাকা অঞ্চলে সংক্রমণের চাপ বেশি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে দেশের প্রায় সব বিভাগেই নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণকে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মার্চ মাসে পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এপ্রিল মাসে দেশজুড়ে শিশুদের হামবিরোধী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। তবে এর আগেই বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লাখ শিশু হামের টিকা পায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সময়মতো টিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করা এবং টিকাদানের ঘাটতি সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাঁদের আশঙ্কা, যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ বিরতি বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিলে তার প্রভাব পরবর্তী সময়েও জনস্বাস্থ্যে পড়তে পারে।
গত প্রায় এক দশকে বাংলাদেশে হামজনিত মৃত্যু অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। সংক্রমণের সংখ্যাও তুলনামূলক কমে এসেছিল। কিন্তু চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই অগ্রগতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এত বিপুলসংখ্যক উপসর্গযুক্ত রোগী এবং মৃত্যুর ঘটনা দেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদান কর্মসূচিতে গাফিলতির বিষয়টিকেও সংক্রমণ বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন গবেষকদের একাংশ। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর পেছনে নির্দিষ্ট কারণগুলোর প্রভাব নির্ধারণে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা এবং সংক্রমণ শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দেশে প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এখন স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। টিকাদানে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত আওতায় আনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপরই পরিস্থিতির উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।


