ট্রেন দুর্ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করলেন স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী

স্পেনে একটি প্রাণঘাতী হাই-স্পিড ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৯ জনের মৃত্যু ও প্রায় ২০০ জন আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর পদত্যাগ করেছেন দেশের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে। স্প্যানিশ দৈনিক এল পাইসের বরাতে জানা গেছে, স্পেনের কংগ্রেসের স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পদত্যাগের চিঠি জমা দেন তিনি। এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানে দেশের রেল ব্যবস্থায় দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটায় তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে আগামী ২৯ নভেম্বরের নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে ভ্যালাডোলিড আসন থেকে সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
২৮ অক্টোবর মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে টোলেডো প্রদেশের উরদা গ্রামের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। লাইনচ্যুত ও থেমে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইরিও’র একটি উচ্চগতির ট্রেনের পেছনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘রেনফে’ সংস্থার অপর একটি গতিশীল ট্রেন সজোরে ধাক্কা দিলে এই ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। তদন্তে দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ওই রুটের ৬৩ কিলোমিটার জুড়ে লাল সংকেত চালু হয়ে সব পরিষেবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের একজন অপারেটর সমস্ত সুরক্ষা সতর্কতা উপেক্ষা করে রেনফে ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন, যা এই মারাত্মক মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটায়।
একই রুটে অল্প সময়ের মধ্যে এমন দুর্ঘটনা স্পেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তাপ ছড়িয়েছে। স্প্যানিশ সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নির্বাচনী প্রচারণাতেও এটি বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো অস্কার পুয়েন্তের কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছে যে, তিনি পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা না দেখে এককভাবে কেবল একজন কন্ট্রোল রুম অপারেটরের ওপর সব দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন।
সমালোচনার মুখে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অস্কার পুয়েন্তে মাদ্রিদ-সেভিল করিডোর অবহেলিত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সংসদকে জানান যে, বর্তমানে ওই রেল রুটে ৭৮ কোটি ইউরো ব্যয়ে আধুনিকীকরণের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি রেল নিরাপত্তা বাড়াতে সরকারের গৃহীত একাধিক জরুরি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ: ১. সুরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর বা বন্ধ থাকলে একক সিদ্ধান্ত নয়, বাধ্যতামূলকভাবে একাধিক অপারেটরের অনুমোদন গ্রহণের ব্যবস্থা চালুকরণ। ২. কন্ট্রোল রুমের অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎ শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার সংযোজন। ৩. ইউরোপীয় রেল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার (ERTMS) দ্রুত আধুনিকায়ন এবং কন্ট্রোল রুমের সার্বিক পরিবেশের মানোন্নয়ন। ৪. দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারের সহায়তায় ৩ কোটি ইউরোর একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা।
এদিকে দেশের ট্রেন চালকদের শীর্ষ সংগঠন ও ইউনিয়ন ‘সেমাফ’ সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রুটির প্রতিবাদে আগামী ১০ ও ১২ নভেম্বর সারাদেশে কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ২০২১ সালে স্পেনের রেল খাতকে বেসরকারি ও প্রতিযোগিতামূলক করার পর থেকে কাজের পরিবেশ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মানে ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক সারা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি নিরাপত্তার জন্য সুখ্যাত ছিল। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই মাদ্রিদ-সেভিল রুটের আন্দালুসিয়ায় দুটি হাই-স্পিড ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান। একের পর এক এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় দেশের বিশ্বস্ত রেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।