কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবার চালান আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে দুই যুবককে নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পাহাড়ি এলাকা থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় আহত অবস্থায় আরও দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের একজনের দাবি, ইয়াবার একটি বড় চালানের হিসাব নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে চার যুবককে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম পানখালী ও লেচুয়াপ্রাংয়ের পেয়ারা বাগানসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময় আহত অবস্থায় আরও দুজনকে উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত দুজন হলেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী এলাকার মৃত আব্দুস সালামের ছেলে মোক্তার কামাল এবং একই এলাকার কালু ফকিরের ছেলে আলী আকবর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে পানখালী বন বিট অফিসসংলগ্ন ভিলেজার পাড়া এলাকায় কয়েকজনকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে একজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তুলাতলী এলাকার ইলিয়াস (৩৫) ও আলী আহমদ (৪০) নামে দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে নিখোঁজ থাকা আরেক ব্যক্তির সন্ধানে অভিযান চালিয়ে আলী আকবরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ইয়াবার চালান নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
আহত ইলিয়াসের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মাদকের চালান নিরাপদে চেকপোস্ট পার করে হোয়াইক্যংয়ের দৈংগ্যাকাটা পাহাড়ে অন্য একটি দলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন আটজন। কিন্তু পথে ডাকাত দলের সদস্যরা তাঁদের কাছ থেকে চালানটি ছিনিয়ে নেয়।
ইলিয়াসের দাবি, ছিনিয়ে নেওয়া চালানটিতে আনুমানিক এক লাখ পিস ইয়াবা ছিল। পরে এর মধ্যে ৭০ হাজার পিস উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকি ৩০ হাজার পিসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এই ৩০ হাজার ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও জানান, ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে হোয়াইক্যংয়ের তুলাতলী এলাকার মিজান তাঁদের চারজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সোমবার (২ নভেম্বর) দিবাগত রাতে বিচারের কথা বলে তাঁদের হ্নীলার একটি দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পরে ওই দলের সদস্যরা চারজনকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাঁদের ব্যাপক মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ইলিয়াস। নির্যাতনকারীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলেও দাবি তাঁর।
ইলিয়াসের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্যাতনের একপর্যায়ে মোক্তার কামালের মৃত্যু হয়। পরে তিনি ও আলী আহমদ আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। তাঁদের সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে পুলিশ আলী আকবরের মরদেহ উদ্ধার করে।
তবে আহত ইলিয়াসের এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়াবার চালানসংক্রান্ত বিরোধই মূল কারণ কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পানখালী ও লেচুয়াপ্রাংয়ের পাহাড়ি এলাকা থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় আহত অবস্থায় আরও দুজনকে উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মাদকের চালান আত্মসাৎ এবং পূর্ববিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটতে পারে। নিহতদের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ওসি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে তিনি জানতে পেরেছেন, ইয়াবাসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। ঘটনার পেছনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
একই এলাকায় ১১ লাখ ইয়াবা উদ্ধার, আটক দুই
এদিকে টেকনাফে একই সময়ে বড় অঙ্কের মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১৫। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভী বাজার আঠারো ঘরপাড়া এলাকার সীমান্তসংলগ্ন একটি ধানখেতে অভিযান চালিয়ে ১১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় দুজনকে আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন হ্নীলা ইউনিয়নের নাইখংখালী এলাকার সলিম উদ্দীনের ছেলে মো. আবছার উদ্দীন (১৯) এবং মৌলভী বাজার এলাকার ছলিম উদ্দীনের ছেলে মো. আদিল (২৬)।
এসআরবি-১৫ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেকনাফ সিপিসি-১ ক্যাম্পের সদস্যরা জানতে পারেন, একটি সংঘবদ্ধ মাদক কারবারি চক্র হ্নীলা সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার বড় চালান দেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। খবর পেয়ে ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ অভিযানিক দল ওই এলাকায় অবস্থান নেয়।
সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহভাজন ৯ থেকে ১০ জনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পর অভিযান শুরু করা হয়। এ সময় দুজনকে আটক করা সম্ভব হলেও অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে ১১ লাখ পিস ইয়াবা এবং পাঁচটি দেশীয় তৈরি বড় রামদা উদ্ধার করা হয়।
৪ নভেম্বর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার মাহমুদুর রহমান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ১১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটির সঙ্গে পাহাড়ে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে দুটি বিষয় নিয়েই তদন্ত চলছে।
মাদক কারবার ঘিরে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং সীমান্তসংলগ্ন যোগাযোগপথকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন চক্র মাদক পরিবহনের চেষ্টা করে। এসব তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে বড় চালান উদ্ধার ও আটকের পাশাপাশি মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধও স্থানীয় জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে মাদক পাচারের অর্থ, চালানের মালিকানা এবং ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বিরোধ কখনো কখনো সংঘর্ষ ও প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তবে টেকনাফের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। চার যুবককে কারা এবং কীভাবে আটক করেছিল, তাঁদের পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে কারা ছিল, ইয়াবার ৩০ হাজার পিস নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পাশাপাশি ১১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুজনের সঙ্গে পলাতক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এবং উদ্ধার করা অস্ত্রের উৎসও তদন্তের বিষয়। যদিও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে পৃথক ঘটনাগুলোর তথ্য ও আলামত যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


