মাগুরায় চলন্ত বাসে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ স্বর্ণ ডাকাতি এবং পরবর্তীতে সেই লুণ্ঠিত মালামালের ভাগাভাগি কেন্দ্র করে সংগঠিত চাঞ্চল্যকর যুবদল নেতা শাকের হোসেন হত্যা রহস্যের জট খুলেছে পুলিশ। মানিকগঞ্জের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ছিনতাই করা ১৫০ ভরি ওজনের ১৪টি স্বর্ণের বার বন্টন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। বিরোধের একপর্যায়ে মাত্র ২০ লাখ টাকার চুক্তিতে ভাড়াটে খুনি এনে প্রকাশ্যে শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী।
আজ বুধবার দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনসের শেড রুমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৬ অক্টোবর। সেদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘গোল্ডেন লাইন পরিবহন’-এর একটি দূরপাল্লার বাস মাগুরার রামনগর এলাকায় পৌঁছালে একদল ডাকাত চড়াও হয়। সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্যরা নিজেদের পুলিশের পরিচয় দিয়ে বাসে ওঠে এবং মানিকগঞ্জের ব্যবসায়ী মজিবর রহমানের কাছে থাকা ১৫০ ভরি ওজনের ১৪টি সোনার বার জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, এই দূরন্ত ডাকাতির ঘটনায় পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মারুফ হোসেন এবং পৌর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক শাকের হোসেনসহ প্রায় ১২ থেকে ১৫ জন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
ডাকাতির পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ সোনার বার ভাগাভাগি করা নিয়ে মারুফ হোসেনের সাথে শাকের হোসেনের মারাত্মক বাকবিতণ্ডা ও চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের জের ধরে শাকেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মারুফ। পুলিশি তথ্যানুযায়ী, গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক গোলাম জাহিদের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে পেশাদার খুনি নিয়োগ করা হয় এবং শাকেরকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পরপরই মাগুরা সদর থানায় পৃথক দুটি—একটি স্বর্ণ ডাকাতি ও অপরটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দুটির দায়িত্ব নিয়ে জোরদার তদন্তে নামে মাগুরা জেলা পুলিশ। দীর্ঘ অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে দুটি মামলায় এ পর্যন্ত মোট ১১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৬ জন হলেন— রনি শিকদার, শামীমা তাবাসসুম, অনিমেষ মজুমদার, প্রধান পরিকল্পনাকারী মারুফ হোসেন, গোলাম জাহিদ এবং বশির আলী। অন্যদিকে, চাঞ্চল্যকর স্বর্ণ ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ৫ জন হলেন— জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ, ফরিদ মন্ডল, পশু হাসপাতালপাড়া এলাকার মিল্টন এবং তাঁর স্ত্রী মারুফা খাতুন।
অভিযান চালিয়ে আসামিদের হেফাজত থেকে লুণ্ঠিত স্বর্ণের মধ্যে ৬১ ভরি ৬ আনা সোনা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। এছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত ও সহায়ক মাধ্যম হিসেবে দুটি মোটরসাইকেল এবং একটি প্রাইভেট কার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জোর দিয়ে বলেন, ঘটনার মূল অভিযুক্তদের অনেকেই ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে। হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মূল শুটারসহ পলাতক অন্যান্য আসামিদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


