জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে তৃতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার দায়ে মো. সাইদুর মুন্সী (৪৫) নামে এক শিক্ষককে আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার পুরো অর্থ ভুক্তভোগী শিশুকে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন বিচারক।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আবদুর রহিম এ রায় ঘোষণা করেন। মামলায় পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত সাইদুর রহমান ওরফে সাইদুর মুন্সী জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের সাকোয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের জুরাল মিস্ত্রীর ছেলে। ঘটনার সময় তিনি স্থানীয় মদিনাতুল উলুম নূরানি মডেল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সাকোয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা জীবিকার সন্ধানে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে ধান কাটার কাজে যান। বাবার অনুপস্থিতিতে শিশুটি স্থানীয় মদিনাতুল উলুম নূরানি মডেল মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার শিক্ষক সাইদুর মুন্সী শিশুটিকে ডেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে তাকে কোলে তুলে বাড়ির দক্ষিণ দুয়ারী টিনের বসতঘরের ভেতরে নিয়ে খাটের ওপর শুইয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় ঘরের দরজার কাছে শব্দ হলে অভিযুক্ত শিক্ষক ঘরের এক কোণে সরে যান। সেই সুযোগে শিশুটি কান্না করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে নিজের বাড়িতে চলে আসে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পরদিন ২৭ এপ্রিল শিশুটির মা মুঠোফোনে বিষয়টি তার স্বামীকে জানান। খবর পেয়ে শিশুটির বাবা পরিচিত ব্যক্তি ও স্থানীয় সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। তবে গাজীপুরে কর্মরত অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফেরার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাঁর হাতে না থাকায় ফিরতে কিছুটা বিলম্ব হয়। অবশেষে ৩০ এপ্রিল তিনি বাড়িতে পৌঁছান।
বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা এবং ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর ৩ মে দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। পরে এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং মামলাটি বিচারের জন্য জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ ওঠে।
মামলার বিচার চলাকালে আদালত পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শুনানি পর্যালোচনা শেষে বিচারক অভিযুক্ত সাইদুর মুন্সীকে দোষী সাব্যস্ত করে আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন।
জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফজলুল হক রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত এ রায় দিয়েছেন। একই সঙ্গে জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী শিশুকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
এ ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীরা শিশুদের কাছে সাধারণত আস্থার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হন। সেই আস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
শিশুরা অনেক সময় ভয়, লজ্জা কিংবা ঘটনার পরিণতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কারণে নির্যাতন বা হয়রানির কথা সহজে জানাতে পারে না। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও শিশুদের আচরণ ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের যথাযথ জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনগত ও মানবিক দায়িত্ব।
দেওয়ানগঞ্জের এ মামলায় আদালতের রায় শিশুদের প্রতি সহিংসতার অভিযোগের বিচারিক গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ভুক্তভোগী শিশুর সুরক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।


