ওয়ানডে ক্রিকেটে বিরাট কোহলির ব্যাটিং-সাফল্যের খাতা এতটাই সমৃদ্ধ যে তাঁর সেরা ইনিংস বেছে নেওয়া যেকোনো ক্রিকেটপ্রেমীর জন্য কঠিন কাজ। ৩০৬ ইনিংসে ৫৫টি সেঞ্চুরি ও ৮০টি হাফসেঞ্চুরি—এমন পরিসংখ্যানের অধিকারী একজন ব্যাটারের পছন্দের তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই থাকার কথা একাধিক স্মরণীয় শতরানের ইনিংস। কিন্তু কোহলির নিজের পছন্দের হিসাবটা একেবারেই আলাদা। তাঁর বিবেচনায় ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস কোনো সেঞ্চুরি নয়, এমনকি কোনো ফিফটিও নয়। বরং ভারতের হয়ে মাত্র ৩৪ বলে করা ৪৩ রানের একটি ইনিংসকেই সবার ওপরে রেখেছেন এই তারকা ব্যাটার।
নিজের ৩৮তম জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন চমকপ্রদ পছন্দের কথা জানিয়েছেন কোহলি। এ উপলক্ষে স্টার স্পোর্টসের এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাঁকে কয়েকটি স্মরণীয় ইনিংসের মধ্যে বেছে নিতে বলা হয়। প্রশ্নোত্তরের ধরনটি ছিল সরাসরি—দুটি ইনিংসের মধ্যে কোনটিকে তিনি এগিয়ে রাখবেন? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে নিজের পছন্দ জানাতে গিয়ে কোহলি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ব্যক্তিগত রান কিংবা রেকর্ডের চেয়ে দলীয় সাফল্য তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম প্রশ্নেই সামনে আসে দুটি উল্লেখযোগ্য ইনিংস। ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ১৩৩ রান, নাকি ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে করা ৩৫ রান—কোনটি সেরা? হোবার্টে ৩২১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত ৪০ ওভারের মধ্যেই জয় নিশ্চিত করেছিল। সেই ম্যাচে কোহলির বিধ্বংসী ব্যাটিং ছিল অসাধারণ। তবু তিনি বেছে নেন মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালের ৩৫ রানের ইনিংস।
এরপর তুলনায় আসে ২০২৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর ৮৫ রান। ১৯৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত যখন মাত্র ৩ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে, তখন দলের হাল ধরেছিলেন কোহলি। গুরুত্বপূর্ণ সেই ইনিংসও তাঁর কাছে ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের ৩৫ রানের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারেনি।
কোহলির পছন্দের তালিকায় এরপর আসে ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২২ এবং ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৬০ রানের ইনিংস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৫১ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত যখন ৬৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে, তখন অধিনায়কোচিত ব্যাটিংয়ে দলকে লড়াইয়ে ফেরান কোহলি। অন্যদিকে, কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৬০ রানের ইনিংসটিও ছিল তাঁর ব্যাটিংশৈলীর অনন্য প্রদর্শন। ওই ইনিংসে শতরানের মধ্যে ১০০ রানই এসেছিল দৌড়ে। কিন্তু এই দুই অসাধারণ ইনিংসও তাঁর কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালের ৩৫ রানের চেয়ে বেশি মূল্য পায়নি।
তবে কোহলির পছন্দের তালিকায় শেষ পর্যন্ত ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের ৩৫ রানকেও ছাড়িয়ে যায় আরেকটি ইনিংস। সেটি ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা ৪৩ রান।
বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি ২০ ওভারে সীমিত হয়ে এসেছিল। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারত মাত্র ৬৬ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায়। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে রবীন্দ্র জাদেজার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ৪৭ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলেন কোহলি। মাত্র ৩৪ বলে ৪৩ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভারত ৫ রানের নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জেতে।
কোহলির মতে, ওই ৪৩ রানের ইনিংসটিই তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা। কারণ, ইনিংসটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যাটিং দক্ষতার পরিচয় ছিল না; বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের প্রয়োজন মেটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও ছিল। ম্যাচের পরিস্থিতি, চাপ সামলে দায়িত্ব নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয়ের আনন্দ—সব মিলিয়ে ইনিংসটি তাঁর কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে।
এই পছন্দের মধ্য দিয়ে কোহলির ক্রিকেট-দর্শনের একটি দিকও স্পষ্ট হয়েছে। ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের জয় তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস থাকলেও যেসব ম্যাচে ভারতের হাতে ট্রফি উঠেছে, সেসব স্মৃতিই তাঁর কাছে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে।
এ কারণেই ২০১২ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৮৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস, ২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৩৮ কিংবা একই বছর বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে করা ১০৭ রানও তাঁর পছন্দের শীর্ষে জায়গা পায়নি।
উল্লেখ্য, কোহলির ওয়ানডে ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে ধারাবাহিকতা, বড় রান করার সামর্থ্য এবং চাপের মুখে ম্যাচ জেতানোর দক্ষতার ওপর। রান তাড়া করার ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ রেকর্ড তাঁকে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবু নিজের সেরা ইনিংস বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি যে মানদণ্ড অনুসরণ করেছেন, তা ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
কোহলির ৫৫টি সেঞ্চুরির ভিড়ে তাই সবার ওপরে জায়গা করে নিয়েছে মাত্র ৪৩ রানের একটি ইনিংস। সংখ্যার বিচারে সেটি হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন নয়, কিন্তু স্মৃতি ও আবেগের বিচারে সেটিই তাঁর কাছে অমূল্য।


