সংগীতজগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন ললিত জে. রাও

ভারতের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশিষ্ট শিল্পী ললিত জে. রাওয়ের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ ৬ নভেম্বর। আগ্রা ঘরানার সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নিজস্ব কণ্ঠশৈলীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারা পরিবেশন এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। দীর্ঘ সংগীতজীবনে কেবল একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নয়, বরং শিক্ষক ও সংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিবেদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিতি অর্জন করেন ললিত। ২০২৬ সালের ৩ জুন ৮৩ বছর বয়সে বেঙ্গালুরুতে তাঁর মৃত্যু হয়।

১৯৪২ সালের ৬ নভেম্বর ভারতের বেঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন ললিত জে. রাও। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র তিন বছর বয়সে আগ্রা ঘরানার প্রখ্যাত শিল্পী ফৈয়াজ খানের একটি সংগীত পরিবেশনা শুনে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। সেই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনায় পরিণত হয়। সংগীতে প্রাথমিক শিক্ষা নেন রামা রাও নায়েকের কাছে। তাঁর মাধ্যমেই আগ্রা ঘরানার সংগীতচর্চার সঙ্গে পরিচিত হন ললিত।

শৈশবেই প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে বেঙ্গালুরু সংগীত সভায় প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে সংগীত পরিবেশন করেন। ১৪ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেন। একই বছর স্বামী হরিদাস সংগীত সম্মেলনে সর্বকনিষ্ঠ অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। অল্প বয়সে এসব অর্জন তাঁর সংগীতজীবনের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

সংগীতের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়ও মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন ললিত। ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ব্রান্সউইক থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে জয়বন্ত রাওকে বিয়ে করার পর দিল্লিতে বসবাস শুরু করেন। সে সময় প্রকৌশল পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংগীতকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। পেশাগত জীবনের সুযোগের চেয়ে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ও সাধনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

নিজের সংগীতজ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করতে পণ্ডিত দিনকর কাইকিনি এবং উস্তাদ খাদিম হুসেন খানের কাছে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তালিম তাঁর পরিবেশনায় গভীরতা ও পরিপক্বতা এনে দেয়। আগ্রা ঘরানার ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেও নিজের কণ্ঠের উপযোগী পরিবেশনার ধরন গড়ে তুলেছিলেন ললিত। ফলে তাঁর সংগীত পরিবেশনায় ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত শৈলীর স্বতন্ত্র সমন্বয় দেখা যেত।

ললিত জে. রাওয়ের পরিবেশনায় খেয়াল, ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরি, তারানা ও হোরির মতো শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ধারার পরিবেশনরীতি ও সংগীতের ব্যাকরণ সম্পর্কে তাঁর গভীর ধারণা ছিল। আগ্রা ঘরানার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে শাস্ত্রীয় সংগীতের সৌন্দর্য শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরতেন তিনি। দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা তাঁর পরিবেশনাকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়।

১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো ভারতের বাইরে সংগীত পরিবেশন করেন ললিত। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা আগ্রা ঘরানার সংগীতকে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর শীর্ষস্থানীয় শিল্পী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। বেতারে তাঁর পরিবেশনা শাস্ত্রীয় সংগীতের শ্রোতাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।

মঞ্চে সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণেও সক্রিয় ছিলেন এই শিল্পী। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘সজন মিলাপ’ নামে একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তাঁর ওস্তাদ সজন পিয়ার সংগীতের প্রচার ও সংরক্ষণ ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের সংগীত ও অবদান যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির ফোর্ড ফাউন্ডেশন আর্কাইভ প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ললিত। সংগীতের ঐতিহাসিক পরিবেশনা সংরক্ষণ এবং গবেষণার উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর পরিবেশিত সংগীত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের নৃতাত্ত্বিক সংগীতবিষয়ক বিভাগেও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ডে সংগীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর আগ্রহের প্রতিফলন ঘটে।

সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জীবদ্দশায় একাধিক সম্মাননা অর্জন করেন ললিত জে. রাও। ২০১৭ সালে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার, তানা রিরি পুরস্কার ও নিশাগন্ধী পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা পান। ২০২৪ সালে পাওয়া গুরু মা অন্নপূর্ণা দেবী পুরস্কারও তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।

জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বেঙ্গালুরুতে বসবাস করে সংগীতচর্চা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ললিত। তাঁর কাছে সংগীত শিখেছেন ভারতী প্রতাপ, নিশান্ত পানিকার, মনোহর পাটবর্ধন, কৈলাশ কুলকার্নি ও প্রতিমা বেল্লাভের মতো শিল্পীরা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা, শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যাকরণ এবং ঘরানার ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৬ সালের ৩ জুন বেঙ্গালুরুতে ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ললিত জে. রাও। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী, শিক্ষক ও ঐতিহ্য সংরক্ষকের বিদায় ঘটে। তবে তাঁর সংগীত পরিবেশনা, শিক্ষাদান এবং আর্কাইভ সংরক্ষণে অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৮৪তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি সংগীত ঘরানার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে শিল্পীর সাধনা, জ্ঞানচর্চা ও পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।