মূল্যস্ফীতিতে কমেছে ক্রেতা, ৫০ শতাংশ ছাড়েও মন্দা পোশাকের বাজার

দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে পোশাকের বাজারে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। গত বছরের তুলনায় অনেক প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে দোকানপাট খোলা রাখার সময় কমে যাওয়ায় ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সাধারণত মৌসুমের শেষ দিকে পুরোনো সংগ্রহের পোশাক বিক্রি করতে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বিশেষ ছাড়ের আয়োজন করে। এ সময় ক্রেতাদের উপস্থিতিও থাকে তুলনামূলক বেশি। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। দোকানে আকর্ষণীয় ছাড়ের ঘোষণা থাকলেও ক্রেতাদের বড় একটি অংশ কেনাকাটা থেকে বিরত থাকছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে দুর্গাপূজার কেনাকাটা শেষ হওয়ায় চাহিদায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত সায়মা ফ্যাশন আউটলেটের ব্যবস্থাপক মো. সাফিন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রতিষ্ঠানটি শালোয়ার-কামিজ, শাড়ি ও লেহেঙ্গাসহ নারীদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক বিক্রি করে। রাজধানীতে তাদের একাধিক শাখা রয়েছে।

সাফিন বলেন, গত বছর ছাড়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই সময়ে দোকানের তাকগুলো প্রায় খালি হয়ে যেত। ক্রেতাদের চাপ সামলাতে গিয়ে কথা বলারও সময় পাওয়া যেত না। অথচ এবার দোকানে পর্যাপ্ত পোশাক থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে কম। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধের প্রভাব এবং এর কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটকে ব্যবসার মন্দার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে ক্রেতারাও খরচের বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছেন।

মূল্যস্ফীতিতে কমেছে ক্রয়ক্ষমতা

দেশে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই চাপ এখনো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় পোশাকের মতো তুলনামূলক কম জরুরি পণ্যে খরচ কমাচ্ছেন অনেকে। ফলে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর ছাড়ের আয়োজনও ক্রেতাদের আগের মতো আকৃষ্ট করতে পারছে না।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সৌমিক দাস বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের কেনাকাটার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের মতো এবার ক্রেতারা পোশাক কিনছেন না। তাঁর হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতাদের আনাগোনা অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে।

তিনি জানান, ছাড়ের সময়ও ক্রেতারা এখন কেবল প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। আগে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ পেলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পোশাক কিনতেন। এখন সেই প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে। অর্থাৎ মূল্যছাড় থাকলেও ক্রেতারা কেনাকাটার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসাবি হয়ে উঠেছেন।

দোকান বন্ধের সময় কমায় বিক্রিতে প্রভাব

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও পোশাকের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের বাজার, শপিং মল ও দোকানপাট খোলা রাখার সময় সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখতে পারত।

ব্যবসায়ীদের মতে, চাকরিজীবী ও কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যা বা রাতে কেনাকাটা করতে বের হন। বিশেষ করে অফিস শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শপিং মলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু দোকান বন্ধের সময় এগিয়ে আসায় অনেক ক্রেতার পক্ষে কেনাকাটার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে সন্ধ্যার পরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সময় হারাচ্ছেন বিক্রেতারা।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড এমব্রেলার বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান কাজী মাকতুম শোভন জানান, টি-শার্ট ও পোলো শার্টের মতো গ্রীষ্মকালীন পোশাকে ছাড় দেওয়ার পরও প্রত্যাশিত বিক্রি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির পরিমাণ তাদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রয়েছে।

তিনি বলেন, রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় ক্রেতাদের উপস্থিতি ও কেনাকাটার সুযোগ দুটোই সীমিত হচ্ছে। দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পর ঈদ সামনে থাকায় ক্রেতাদের কেনাকাটার পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এসেছে। আগামী কয়েক মাসেও বিক্রি লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

ছাড় দিয়েও মিলছে না প্রত্যাশিত বিক্রি

ফ্যাশন ব্র্যান্ড রাইজের সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মুক্তার হোসেনও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, শীতের আগের মৌসুমে ছাড়ের আয়োজন করেও এবার গত বছরের মতো বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, গত বছরের অক্টোবরে ছাড়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ লাখ টাকার পোশাক বিক্রি করেছিল। এবার একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

মুক্তার হোসেনের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ পোশাক কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। চলতি মৌসুমে দোকানে ক্রেতাদের উপস্থিতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যারা দোকানে আসছেন, তাঁদের মধ্যেও তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা করছেন।

আরেকটি পরিচিত লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যাটস আইয়ের অনলাইন বিক্রয় নির্বাহী সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। তাঁর মতে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা পর্যবেক্ষণ করছেন অনেক ক্রেতা। এ কারণে প্রয়োজন না হলে তাঁরা নতুন পোশাক কেনা থেকে বিরত থাকছেন।

আবহাওয়ার পরিবর্তনেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা

পোশাকের বাজারে মন্দার পেছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আবহাওয়ার প্রভাবও রয়েছে। সাধারণত নভেম্বরের শুরুতে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে শীতের পোশাকের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু এবার আবহাওয়ার ধরন প্রত্যাশা অনুযায়ী শীতের দিকে এগোয়নি।

ফলে শীতের পোশাক বাজারে তোলার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। একদিকে গরমের পোশাকের মজুত বিক্রি করতে ছাড় দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে শীতের নতুন সংগ্রহ বাজারে আনার সময় নিয়েও নিশ্চিত হতে পারছেন না তাঁরা। আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তা পোশাকের চাহিদা ও মজুত ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ব্র্যান্ডবিহীন পোশাকের দোকানগুলোতেও একই পরিস্থিতির প্রভাব দেখা গেছে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত অনেক দোকানে শীতের নতুন পোশাক তোলা হয়নি। কিছু ব্যবসায়ী পুরোনো মজুতের পোশাক ছাড় দিয়ে বিক্রির চেষ্টা করছেন।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়ছে

স্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের অর্থ পরিচালক সানাউল হক বাবুল জানান, মৌসুমের শেষ দিকে বিক্রি বাড়াতে পোশাকে ছাড় দেওয়া ফ্যাশন ব্যবসার দীর্ঘদিনের প্রচলিত কৌশল। এ সময় ক্রেতারা কম দামে পোশাক কেনার সুযোগ পান, আর ব্যবসায়ীরা পুরোনো সংগ্রহের পণ্য বিক্রি করে নতুন পণ্যের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারেন।

তবে এবার দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পোশাকের চাহিদায় চাপ তৈরি করেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ফ্যাশন খাতে বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা না ফিরলে পোশাকের বাজারে দ্রুত স্বাভাবিক চাহিদা ফিরে আসবে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের বিক্রি আরও চাপে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে এবারের ছাড়ের মৌসুমে পোশাকের দোকানগুলোতে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ তুলনামূলক কম। ব্যবসায়ীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পণ্যে ছাড় দেওয়া নয়, বরং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও কেনাকাটার আস্থা ফিরিয়ে আনা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।