বেলজিয়ামের দিনাঁ শহরে ১৮১৪ সালের ৬ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন অ্যাডলফ স্যাক্স। তার পুরো নাম অ্যান্টোইন-জোসেফ স্যাক্স। ছোটবেলা থেকেই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তার বাবা চার্লস-জোসেফ স্যাক্সও ছিলেন একজন বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা। পারিবারিক পরিবেশ এবং নিজস্ব সৃজনশীলতা অ্যাডলফ স্যাক্সকে নতুন ধরনের বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তী সময়ে তার উদ্ভাবিত স্যাক্সোফোন সংগীতের জগতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়।
উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে তিনি স্যাক্সোফোনের নকশা তৈরি করেন। ১৮৪১ সালে নিজের উদ্ভাবনটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন এবং ১৮৪৬ সালে প্যারিসে বাদ্যযন্ত্রটির পেটেন্ট গ্রহণ করেন। তার পরিকল্পনা ছিল এমন একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা, যাতে কাঠের বাঁশিজাতীয় বাদ্যযন্ত্রের সুরের নমনীয়তা এবং পিতলের বাদ্যযন্ত্রের মতো শক্তিশালী শব্দের সমন্বয় থাকবে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় স্যাক্সোফোন।
দেখতে স্যাক্সোফোন অনেকটা বাঁকানো ধাতব নলের মতো। সাধারণত পিতল দিয়ে তৈরি হলেও এটি ব্রাস বা পিতলের বাদ্যযন্ত্রের শ্রেণিতে পড়ে না; বরং উডউইন্ড বা কাঠের বাঁশিজাতীয় বাদ্যযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। এর পেছনে রয়েছে শব্দ তৈরির বিশেষ পদ্ধতি। স্যাক্সোফোনের মুখপাত্রের সঙ্গে একটি পাতলা রিড যুক্ত থাকে। বাদক এতে ফুঁ দিলে রিডের কম্পনের মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। এরপর আঙুলের সাহায্যে বিভিন্ন কী নিয়ন্ত্রণ করে কাঙ্ক্ষিত সুর তোলা হয়।
এই বাদ্যযন্ত্রের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সুরের বৈচিত্র্য। একই স্যাক্সোফোন থেকে কোমল, মসৃণ ও আবেগপূর্ণ সুরের পাশাপাশি তীক্ষ্ণ, শক্তিশালী এবং উদ্দীপনাময় আওয়াজ তৈরি করা সম্ভব। সুরের এই পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যই একে অন্যান্য অনেক বাদ্যযন্ত্রের তুলনায় স্বতন্ত্র করেছে। সংগীতশিল্পীরা পরিবেশনা ও সুরের ধরন অনুযায়ী এর শব্দকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
স্যাক্সোফোনের সঙ্গে জ্যাজ সংগীতের সম্পর্ক বিশেষভাবে গভীর। বিংশ শতাব্দীতে জ্যাজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রটির পরিচিতিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে জ্যাজের তাৎক্ষণিক সুর সৃষ্টি বা ইম্প্রোভাইজেশনের ক্ষেত্রে স্যাক্সোফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন শিল্পী নিজের দক্ষতা, কল্পনা ও আবেগের সমন্বয়ে একই সুরকে ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।
তবে জ্যাজের বাইরেও এর ব্যবহার ব্যাপক। ব্লুজ, পপ, রক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন পরিবেশনায় স্যাক্সোফোনের উপস্থিতি রয়েছে। চলচ্চিত্রের আবহসংগীত, ব্যান্ড পরিবেশনা এবং একক সংগীতেও এটি বিশেষ মাত্রা যোগ করে। কখনো একটি কোমল সুর গানের আবেগ বাড়িয়ে দেয়, আবার কখনো শক্তিশালী পরিবেশনা পুরো সংগীতের গতিই বদলে দিতে পারে।
স্যাক্সোফোনের বিভিন্ন ধরনও সংগীতের জগতে এর ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করেছে। সোপ্রানো, অল্টো, টেনর ও ব্যারিটোন—এই চার ধরনের স্যাক্সোফোন সবচেয়ে বেশি পরিচিত। প্রতিটির আকার ও সুরের উচ্চতায় পার্থক্য রয়েছে। সোপ্রানো স্যাক্সোফোন তুলনামূলক উঁচু স্বরের সুর তৈরি করে। অল্টো ও টেনর স্যাক্সোফোন বিভিন্ন সংগীতধারায় বহুল ব্যবহৃত। অন্যদিকে ব্যারিটোন স্যাক্সোফোন আকারে বড় এবং এর সুর তুলনামূলক গভীর ও ভারী।
জাতীয় স্যাক্সোফোন দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো এই বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাস ও সংগীতে এর অবদান স্মরণ করা। একই সঙ্গে উদ্ভাবক অ্যাডলফ স্যাক্সের সৃজনশীলতাকে সম্মান জানানো এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্যাক্সোফোন শেখার আগ্রহ তৈরি করাও এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।
একটি নতুন বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবন কীভাবে বিশ্বসংগীতের ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে, স্যাক্সোফোন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। অ্যাডলফ স্যাক্সের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা এই বাদ্যযন্ত্র সময়ের সঙ্গে সংগীতের নানা ধারায় নিজের জায়গা তৈরি করেছে। দুই শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়েও এর আবেদন কমেনি। বরং স্বতন্ত্র সুর, আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা এবং বহুমুখী ব্যবহারের কারণে স্যাক্সোফোন আজও সংগীতপ্রেমী ও শিল্পীদের কাছে সমান জনপ্রিয়।


