গোপালগঞ্জে তিনটি মামলায় ২ হাজার ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৪৮ জনকে শুক্রবার সদর থানায় করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ জুলাই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) ড. রুহুল আমিন সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তার ও আটককৃতদের বেশির ভাগই তরুণ-যুবা। কেউ কারখানার শ্রমিক, কেউ রিকশাচালক, কেউ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কাজ করেন। সবার স্বজনই দাবি করেছেন, তাদের স্বামী-সন্তানরা নির্দোষ। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন।
গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) ড. রুহুল আমিন সরকার বলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে আটকদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। অপরাধসংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলেই কেবল তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।
গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে। আরও একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। ওই দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় গুলিতে চারজন নিহত হন। আহত একজন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল পাঁচ। নিহতরা সবাই বয়সে তরুণ।
দশম শ্রেণি পড়ুয়া দীপু বল্লভ (১৬) লেখাপড়ার পাশাপাশি জারে ভরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কাজ করে। মা লতিকা বল্লভ জানান, তার স্বামী অসিত বল্লভ অসুস্থ বলে ছেলে কাজ শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় পানি সরবরাহের জন্য গেলে তাকে আটক করা হয়।
একই সঙ্গে আটক করা হয় পানি সরবরাহের ব্যবসায় যুক্ত নয়ন দাসকে (২০)। তার মা মিনতি দাস জানান, ডিগ্রিতে (স্নাতক) ভর্তি হয়েছিলেন নয়ন। আর্থিক অনটনের কারণে পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি। পানি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে উপার্জন করতেন। তার বাবা নেই।
৬০ বছর বয়সী মাছ ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বুধবারের সংঘর্ষের সময় শহরের আদালত এলাকায় ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে বিল কাজলিয়া এলাকার বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। তার স্ত্রী নূর নাহার জানান, জমিসংক্রান্ত মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এসেছিলেন দেলোয়ার। ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে আহত হন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফিরে যান। তিনি কোনো রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে যান না। তবু তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ চাষ করেন ৭০ বছর বয়সী মোদক হালদার। পরিবার নিয়ে থাকেন শহরের কুয়োডাঙা এলাকায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি পুলিশলাইন এলাকায় চা খেতে গেলে তাঁকে আটক করে পুলিশ। তাঁর স্ত্রী শিখা হালদার ও পুত্রবধূ রমা বিশ্বাস দাবি করেন, বয়স্ক মানুষটি কারও সাতেপাঁচে নেই। রাজনীতির সঙ্গে কখনোই ছিলেন না।
কয়েকজন যুবককেও ধরে এনেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ২৩ বছর বয়সী ওসমান গনি ওরফে শুকচান বাগচী (ধর্মান্তরিত) পেশায় অটোরিকশা চালক। তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম জানান, পরিবারের সঙ্গে সদরের মানিকদহ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকেন গনি। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে গেটপাড়া এলাকা থেকে বাসায় ফেরার পথে তাকে আটক করা হয়।
আরেক রিকশাচালক ইশা খন্দকারকে (২৩) আটক করা হয় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে চৌরঙ্গী এলাকা থেকে। তার স্ত্রী সানজিদা বেগম জানান, সদরের বেতগ্রাম এলাকায় থাকেন তারা। পুলিশ থামতে বললে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপর তাঁকে ধাওয়া করে ধরে পুলিশ।
গোপালগঞ্জ সদরের চরমানিকদহ এলাকার ২৬ বছর বয়সী আরমান হোসেন পেশায় ইজিবাইক চালক। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে লঞ্চঘাট থেকে তাকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়েছিলেন। তবে তার বাবা জুম্মন মোল্লার দাবি, ‘ওই সময় আমার ছেলে নড়াইলের যোগানিয়া বাজার ঘাট এলাকায় ছিল।’
অটোরিকশাচালক অনিক (১৯) পরিবারের সঙ্গে থাকেন সদরের মানিকদি গুচ্ছগ্রাম এলাকায়। তার বাবা এবাদুল মিয়া জানান, অনিক ও তার খালাতো ভাই তরিককে (২২) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে লঞ্চঘাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই তরুণকে নির্দোষ দাবি করেন এবাদুল।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান রাতে বলেন, সদরে গ্রেপ্তার ৪৮ জনকে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
খবরওয়ালা/এমইউ



