খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলো এখন একজোট হয়ে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, মাদক কারবার এবং খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে তারা সক্রিয়। আগে এসব ছোট ছোট গ্যাং আলাদাভাবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখলেও, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পাঁচটি গ্যাং একজোট হয়েছে। এই গ্যাংগুলো হলো ‘রনি-জনি’, ‘টুন্ডা বাবু’, ‘পানি রুবেল’, ‘ভাইগ্না বিল্লাল’ ও ‘কবজি কাটা গ্রুপ’। স্থানীয় পুলিশ এবং একাধিক গ্যাং সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বুধবার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার একজন সক্রিয় কিশোর গ্যাং সদস্য জানান, এক বছর আগেও এই এলাকায় ছোট ছোট গ্যাংগুলোর মধ্যে নিজেদের মধ্যে সংঘাত হতো। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। ‘কবজি কাটা গ্রুপ’ সব গ্যাংকে এক করেছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘কবজি কাটা গ্রুপের’ আনোয়ার ওরফে ‘কবজি কাটা আনোয়ার’ ওরফে ‘শুটার আনোয়ার’ পুরো এলাকার নেতৃত্ব নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আদাবর বালুর মাঠভিত্তিক ‘রনি-জনি’ গ্যাংয়ের একটি ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কবজি কাটা গ্রুপের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের লড়াই হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতে রনি-জনি গ্যাং পরাজিত হয়। সে সময় আরেক গ্যাং লিডার টুন্ডা বাবু মধ্যস্থতা করে। টুন্ডা বাবু হলো রনি ও জনির দুলাভাই। রনি-জনি গ্যাং কবজি কাটা গ্রুপের সঙ্গে যোগ দিলে, পুরোনো সম্পর্কের কারণে টুন্ডা বাবু গ্রুপও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ‘ভাইগ্না বিল্লাল গ্রুপ’ এবং ‘পানি রুবেল গ্রুপ’ এলাকায় দুর্বল হয়ে পড়ায় তারাও কবজি কাটা গ্রুপের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। সবার আলাদা নাম ও নেতৃত্ব থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করে কবজি কাটা গ্রুপের আনোয়ার। বর্তমানে আনোয়ার কারাবন্দি থাকায় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে রনি, জনি ও ওসমান।
এই গ্যাং সদস্যের ভাষ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম জাকারিয়া। তিনি জানান, এখন আর কোনো গ্যাং আলাদা নেই, সবাই একজোট হয়েছে। রনি, জনি, পানি রুবেল ও ভাইগ্না বেলাল সবাই এখন এক গ্রুপ।
গত সোমবার রাত ১১টার দিকে আদাবর থানা পুলিশ খবর পায় যে সুনিবিড় হাউজিংয়ের একটি গ্যারেজে ‘রনি-জনি গ্যাং’ দুজন ব্যক্তিকে জিম্মি করে মারধর করে ৩০ হাজার টাকা আদায় করছে। এই খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গেলে রনি-জনিসহ প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন চাপাতি ও ছুরি নিয়ে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আল আমিন নামে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন এবং আরও দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে কাজে ফেরেন। এ ঘটনায় আদাবর থানায় মামলা হয়েছে এবং রনি-জনিসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ রনি-জনিকে গ্রেপ্তার করে। ডিবি তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিন ভাইয়ের এক গ্যাং ‘রনি-জনি গ্রুপ’: আদাবর বালুর মাঠ থেকে গড়ে ওঠা ‘রনি-জনি গ্রুপ’ দুই ভাইয়ের নামে পরিচিত হলেও এটি চালায় তিন ভাই। অপর ভাইয়ের নাম ওসমান, যে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকত। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অপরাধে বড় ভাইয়ের চেয়ে ছোট ভাই এগিয়ে: রনি ও জনির মধ্যে রনি বড় হলেও অপরাধ কর্মকাণ্ডে জনি বেশি সক্রিয়। তাদের পিসিপিআর (অপরাধী রেকর্ড) থেকে জানা যায়, গত প্রায় দুই বছরে জনির নামে আদাবর থানায় ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই হত্যাচেষ্টা, অবৈধ অস্ত্র বহন, অপহরণ ও মাদক সংক্রান্ত। রনির নামে ঢাকার আদাবর থানা এবং কুড়িগ্রামের উলিপুর থানায় মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। এক মাস আগেও তারা একটি মামলায় জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। ওসমান, রনি ও জনির পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রামের উলিপুরে। তাদের বাবা রফিকুল ইসলাম খোকন প্রায় ১৫ বছর আগে পরিবার নিয়ে ঢাকার আদাবর এলাকায় আসেন। সেখানেই বড় হয়ে এই তিন ভাই প্রথমে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং পরে গ্যাং গড়ে তোলে। এখন তারা মাদক ব্যবসাও করে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রনি-জনি গ্যাং বালুর মাঠে একটি নতুন গাঁজার স্পট খুলেছিল। পুলিশের অভিযানের ভয় ছিল তাদের মধ্যে। ঘটনার দিন মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্যের গাড়ি দেখে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গ্রেপ্তার অভিযানে থাকা এক ডিবি সদস্য বলেন, মূলত এই স্পটটি ‘কবজি কাটা গ্রুপের’ আনোয়ারের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়। আনোয়ার জেলে বসেই নানা অপরাধের নির্দেশনা দেয়, যেমন—কোথায় ভাড়াটে হিসেবে যেতে হবে বা কার ওপর আক্রমণ করতে হবে।
গ্রেপ্তারের পর রনি, জনিসহ অন্যান্য গ্যাং সদস্যকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তেজগাঁও বিভাগের গোয়েন্দা শাখার ডিসি রাকিব খান জানান, তারা আদাবর সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। মারামারি, কবজি কাটা, এবং বহু মানুষকে কুপিয়ে আহত ও পঙ্গু করেছে। কবজি কেটে তারা টিকটকে ভিডিও বানিয়ে উল্লাস করত। তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, মাদক সেবন, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এছাড়াও অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জবর-দখল, ভাড়ায় শক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের মতো অপকর্মও করে।
খবরওয়ালা/টিএসএন