বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ইতিহাসের সর্বনিম্নে, বিনিয়োগও স্থবির

দেশের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। পুঁজিবাজারেও দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি না হয়ে বরং ঋণ স্থিতি ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হ্রাস পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা তিন অর্থবছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্পে ঝুঁকছেন না। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একে ‘ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি’ আখ্যা দিয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমে যাওয়া ও রাজস্ব ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেছে জিইডি। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২.৩৯ শতাংশ। আবার আগস্টে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকার কারো সঙ্গে আলোচনা না করেই ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়াচ্ছে। এতে ব্যবসার খরচ বেড়েছে, ঋণ পাওয়া কঠিন হয়েছে। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, “আমরা এখন ব্যবসা বাড়ানোর কথা ভাবছি না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই চ্যালেঞ্জ।”

এদিকে, অনেক ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি লাভজনক মনে করছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “নতুন ঋণ কার্যত নেই। আমদানিও কম, তাই ঋণ স্থিতি ঋণাত্মক হয়েছে।”

শুধু বেসরকারি নয়, গত ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের ঋণ স্থিতিও কমেছে ৮ হাজার কোটির বেশি। সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, “উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নন। চাহিদা না থাকায় ঋণ দেওয়ার সুযোগও সীমিত।”

অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি দেড় বছর ধরে আইপিও আনতে পারেনি। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩৬০ হলেও সম্প্রসারণে নতুন বিনিয়োগ ঘোষণা দিয়েছে মাত্র ১২টি, যার পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও কর নীতির বৈষম্যের কারণে ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। এজন্য সুদহার নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাট-ট্যাক্সে স্বস্তি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

খবরওয়ালা/এমএজেড

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।