জিয়াউল হক মুক্তা
প্রকাশ: ১২ই নভেম্বর ২০২৫, ৬:৩৪ পিএম
৭৯তম জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা
১২ নভেম্বর ২০২৫ — আজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি, মেহনতি নিপীড়িত-নির্যাতিত জনতার কণ্ঠস্বর, বিশিষ্ট রাজনীতিক জননেতা হাসানুল হক ইনুর ৭৯তম জন্মদিন।
১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর নওগাঁ জেলার নিজ নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এ.এইচ.এম. কামরুল হক ও মাতা বেগম হাসনা হেনার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। নীতিনিষ্ঠ ও শিক্ষিত পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ইনু শৈশব থেকেই ছিলেন মেধাবী ও আদর্শনিষ্ঠ।
শিক্ষাজীবনে তিনি কর্ণফুলি পেপার মিল হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ক্রীড়াবিদ—ঢাকার প্রথম বিভাগের ফুটবল খেলোয়াড় এবং জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেট।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফাকে স্বাধীনতার এক দফা আন্দোলনে রূপ দিতে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি যোগ দেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭০ সালে ‘ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী’ নামে ছাত্রলীগের উদ্যোগে স্বাধীনতা আন্দোলনের সামরিক প্রস্তুতির নেতৃত্ব দেন, যা পরবর্তীতে ‘জয় বাংলা বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ তিনি পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন — সেদিনই প্রথম সারা দেশে একযোগে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ভারতের দেরাদুনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী)-এর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রায় দশ হাজার গেরিলা যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে জাতীয় কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি প্রণয়ন ও সংগঠনের কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এ যোগ দেন এবং ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
দল নিষিদ্ধ হলে তিনি কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নেতৃত্বে বিপ্লবী গণবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মহান সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি কর্নেল তাহেরের সহযোগী হিসেবে নেতৃত্ব দেন।
অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে ২৩ নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে প্রহসনমূলক বিচারে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
১৯৮০ সালের ১৩ জুন তিনি মুক্তি পান।
গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামে
মুক্তির পর থেকে তিনি দেশজুড়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৮২ সালে এরশাদবিরোধী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও পরবর্তীতে ১৫ দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৮৬ সালে তিনি জাসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে ২০০২ সালে সভাপতি হন।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে ঐক্য ও কৌশল প্রণয়নে তিনি ছিলেন অন্যতম মেধাবী নেতৃত্ব।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনেও তিনি জাসদকে সক্রিয় রাখেন।
২০০৫ সালে তিনি ১৪ দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
২০০৮ সালে তিনি কুষ্টিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তথ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি সংসদের ভেতরে-বাইরে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।
সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ
জননেতা হাসানুল হক ইনু কেবল রাজনীতিকই নন — তিনি একজন পরিশীলিত সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ, দক্ষ কৌশলবিদ ও লেখক।
রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও গণআন্দোলন বিষয়ক তাঁর বহু প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি ছাত্রদের ন্যায্য দাবির পক্ষে অবস্থান নেন।
সরকারের প্রতি তিনি শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও সমাধানের আহ্বান জানান, সহিংসতা এড়াতে অবিরাম প্রচেষ্টা চালান।
তবুও ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে একাধিক মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় জড়িয়ে নিপীড়নের শিকার করা হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে তাঁকে ও তাঁর আইনজীবীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে— যা গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
আমাদের প্রত্যাশা
এই দিনে আমরা জননেতা হাসানুল হক ইনুকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও মুক্তির কামনা।
আমরা তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি এবং সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাই।
তিনি বাঙালি জাতির সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে অবিচল এক প্রতীক।
জনতার কণ্ঠস্বর — আজও তাঁর নেতৃত্বে আমরা ন্যায় ও সত্যের পথে আলোকিত হতে চাই।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক এনজিও ব্যাক্তিত্ব।
মন্তব্য