যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। নতুন ভিসা নীতির কড়াকড়ির পর বাংলাদেশের ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ভিসার অপব্যবহার, আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন বৃদ্ধি এবং ভিসা বাতিলের উচ্চ হার—এ তিন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকি কমাতে ভর্তি স্থগিত করছে।
কারা ভর্তিতে বাধা দিচ্ছে?
চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়—পাকিস্তান থেকে ভর্তি পুরোপুরি বন্ধ
উলভারহ্যাম্পটন—বাংলাদেশ–পাকিস্তান থেকে স্নাতক ভর্তি গ্রহণ নয়
ইস্ট লন্ডন—পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত
সান্ডারল্যান্ড, কভেন্ট্রি, অক্সফোর্ড ব্রুকস, লন্ডন মেট্রোপলিটন, বিপিপি—কোথাও CAS লেটার স্থগিত, কোথাও আবেদন গ্রহণ বন্ধ
বিশেষ করে CAS লেটার না দেওয়া হচ্ছে—যা বাস্তবে ভর্তিতে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা।
নতুন ভিসা নীতি: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন আতঙ্কিত?
সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে যুক্তরাজ্যের Home Office নতুন নীতিমালা চালু করেছে—Basic Compliance Assessment (BCA)।
এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিনটি সূচকে মান রাখতে হবে—
ভিসা রিজেকশন রেট
ক্লাস অনুপস্থিতি
ড্রপ–আউট রেট
৫% এর বেশি ভিসা বাতিল হলেই স্পনসর লাইসেন্স স্থগিত হতে পারে।
এটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরাসরি অস্তিত্ব সংকট সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভয়াবহ
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী—
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ভিসা বাতিল ২২%
পাকিস্তানি আবেদনকারীদের ১৮%
এই হার নতুন সীমার চারগুণ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকির কারণে ভর্তি স্থগিত করছে।
অভিবাসন রাজনীতির প্রভাব
সীমান্ত নিরাপত্তামন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ইগল স্পষ্ট বলেছিলেন—
“স্টুডেন্ট ভিসা যেন যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার পেছনের দরজা না হয়।”
রাজনৈতিকভাবে কড়া অভিবাসন অবস্থান দেখানো এখন সরকারের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই চাপের মধ্যে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পথ কেন সংকুচিত হচ্ছে?
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন বেড়েছে দ্বিগুণ
অনেক আবেদনকারীর পূর্ব ভিসা ছিল “স্টুডেন্ট”
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্দেহ করছে, অনেকে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যে ঢোকার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা ব্যবহার করছে
কোর্সে উপস্থিত না থাকা ও মাঝপথে কোর্স ত্যাগের ঘটনা বাড়ছে
ফল—সব আবেদনকারীই “উচ্চ ঝুঁকির” তালিকায় পড়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ
গ্লোবাল অ্যাডমিশনের পরামর্শক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন—
“অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী UK-কে ট্রানজিট রুট হিসেবে দেখে। কোর্স শেষ না করে ভিসা পরিবর্তন বা আশ্রয় আবেদন করে।”
ফলে প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও একই শাস্তির আওতায় পড়ছে।
প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ক্ষতি
ভর্তি নিশ্চয়তাপত্র (CAS) পাচ্ছে না
ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ কমছে
শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বাতিল—বড় আর্থিক ক্ষতি
একাডেমিক স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলেন—বর্তমান নীতি “collective punishment” তৈরি করছে—যেখানে সীমিতসংখ্যক অপব্যবহারকারীকে কেন্দ্র করে পুরো দেশের শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত।
উপসংহার
যুক্তরাজ্য একদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সফল হতে চাইছে, অন্যদিকে বিশ্বমানের শিক্ষা বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হচ্ছে। এই দুই চাপে ভিসা নীতি এমন হয়েছে যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের ও পাকিস্তানের প্রকৃত শিক্ষার্থীরা।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে—তবে স্পষ্ট বার্তা হলো:
UK এখন আর সহজ গন্তব্য নয়—স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহার বন্ধ না হলে সমস্যা আরও বাড়বে।



